ইসরায়েলের ভয়াবহ বিমান হামলায় নিহত লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর প্রধান সায়েদ হাসান নাসরুল্লাহর মরদেহ অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলিতে বিমান হামলার স্থান থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। রোববার (২৯ সেপ্টেম্বর) মেডিকেল এবং নিরাপত্তা সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, নাসরুল্লাহর মরদেহ অক্ষত রয়েছে। এর আগে, শনিবার হিজবুল্লাহর বিবৃতিতে নাসরুল্লাহর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হলেও, তিনি ঠিক কীভাবে নিহত হয়েছেন তা বলা হয়নি।
মরদেহ উদ্ধারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্র দুটি জানিয়েছে, ‘তার শরীরে সরাসরি কোনো ক্ষত বা আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে বিস্ফোরণের ফলে ব্লান্ট ট্রমায় তার মৃত্যু হয়েছে।’ ব্লান্ট ট্রমা হলো- ভয়াবহ বিস্ফোরণের ফলে শরীরের বাইরে বড় ধরনের কোনো আঘাতের চিহ্ন দেখা যায় না। কিন্তু শরীরের ভেতর ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
শনিবার (২৮ সেপ্টেম্বর) ইসরায়েলের বিমান হামলায় হিজবুল্লাহর প্রধান হাসান নাসরুল্লাহ নিহতের বিষয়টি নিশ্চিত করে লেবাননের প্রতিরোধ সশস্ত্র গোষ্ঠীটি। শুক্রবার (২৭ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় বৈরুতে ব্যাপক হামলা চালায় ইসরাইল। ওই হামলায় নাসরুল্লাহ নিহত হন।
তার আগে হাসান নাসরুল্লাহকে বিমান হামলা চালিয়ে হত্যার দাবি করে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। লেবাননের দক্ষিণ উপশহরে অবস্থিত হিজবুল্লাহর সদর দপ্তর লক্ষ্য করে শুক্রবার হামলা চালায় ইসরায়েলি বিমান বাহিনী। এতে হাসান নাসরুল্লাহ নিহত হয়েছেন বলে শনিবার দাবি করে তেল আবিব।
তাৎক্ষণিকভাবে ইসরায়েলের এমন দাবি নিয়ে কোনো মন্তব্য না করলেও, পরে বিষয়টি নিশ্চিত করে প্রতিরোধ যোদ্ধার দল হিজবুল্লাহ।
কে এই হাসান নাসরাল্লাহ : তিন দশকের বেশি সময় ধরে ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর প্রধান হাসান নাসরাল্লাহ। নানা চড়াই উৎরাই পার করে গোষ্ঠীটিকে একটি সুসংহত অবস্থানে নিয়ে গেছেন তিনি। ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের সব অপরাধের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ এক কণ্ঠ ছিলেন তিনি। তাই মধ্যপ্রাচ্যে জায়নবাদীদের হিটলিস্টে সব সময়ই শুরুর দিকে ছিলেন এই নেতা।
আততায়ীর হামলা থেকে নিজেকে বাঁচাতে বহু বছর ধরেই জনসম্মুখে আসেননি নাসরাল্লাহ। তবে আড়াল থেকে হিজবুল্লাহকে রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে সংগঠিত করার কাজ করে গেছেন। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠী হামাস, ইরাক ও ইয়েমেনের মিলিশিয়া বাহিনীকে প্রশিক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি। ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখেছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির সঙ্গে।
১৯৭৫ সালে লেবানন গৃহযুদ্ধের মুখে পড়লে শিয়া আন্দোলন আমালে যোগ দেন হাসান নাসরাল্লাহ। ইরাকের নাজাফে শিয়া সম্প্রদায়ের একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেন। ইরাক থেকে তাকে বের দিলে লেবাননে ফিরে আবার আমালে যোগ দেন। ১৯৮২ সালে সংগঠনটির শীর্ষ নেতারা প্রতিষ্ঠা করেন ‘ইসলামিক আমাল’, যা সে সময় ইসরায়েলি আগ্রাসন প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে। এতে সহযোগিতা করে প্রতিবেশী দেশ ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী। পরবর্তীতে ইসলামিক আমাল থেকে গঠিত হয় হিজবুল্লাহ বা আল্লাহর দল নামে সংগঠন।
‘ওপেন লেটার’ নামে একটি প্রকাশনা বের করার মধ্য দিয়ে ১৯৮৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে হিজবুল্লাহ। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নকে ‘ইসলামের প্রধান দুই শত্রু’ হিসেবে আখ্যা দেয় সশস্ত্র গোষ্ঠিটি। সেই বছর ইসরায়েলকে ধ্বংস করার অঙ্গীকারও করে তারা। ১৯৯২ সালে জায়নবাদী আততায়ীর হাতে আব্বাস আল মুসাবি নিহত হলে হেজবুল্লাহ প্রধানের দায়িত্ব নেন হাসান নাসরাল্লাহ। তার জন্ম ১৯৬০ সালে বৈরুতের পূর্বাঞ্চলীয় উপকণ্ঠের বুর্জ হাম্মুদে। ৯ ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড় তিনি। তাদের বাবা ছিলেন সবজি বিক্রেতা।