বৈরুত, ৯ অক্টোবর : লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আওন বৃহস্পতিবার ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে স্বাক্ষরিত যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি একে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠার “গুরুত্বপূর্ণ সূচনা” বলে মন্তব্য করেন।
আওন আশা প্রকাশ করেন, এই যুদ্ধবিরতি গাজার মানবিক সংকট কমাতে এবং স্থায়ী শান্তির পথে এগিয়ে যেতে সহায়ক হবে। তিনি বলেন, “এই চুক্তি যেন কেবল অস্থায়ী বিরতি না হয়ে, টেকসই শান্তির ভিত্তি তৈরি করে।”
প্রেসিডেন্ট আওন আরও বলেন, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত ২০০২ সালের বৈরুত আরব শান্তি উদ্যোগের আলোকে একটি ন্যায্য ও স্থায়ী সমাধানের জন্য একযোগে কাজ করা।
তিনি ইসরায়েলের প্রতি আহ্বান জানান লেবানন ও সিরিয়া সীমান্তে সামরিক হামলা বন্ধ করতে, এবং শান্তি প্রক্রিয়া অগ্রসর হওয়ার সুযোগ তৈরি করতে। “গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠা যদি লেবাননের উপর নতুন হামলার কারণ হয়, তবে সেটি কখনোই টেকসই হবে না,” আওন সতর্ক করেন।
দেশের অভ্যন্তরে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে লেবানন সরকার সেপ্টেম্বর মাসে একটি গোপন সামরিক পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে। এই পরিকল্পনার আওতায় সেনাবাহিনী দেশজুড়ে অবৈধ অস্ত্র জব্দ, সেনা পুনর্বিন্যাস ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
লেবাননের শরণার্থী ও প্রযুক্তি বিষয়ক মন্ত্রী কামাল শেহাদে জানান, সেনাবাহিনীর এই অভিযান “জাতীয় স্থিতিশীলতার ভিত্তি”। পরিকল্পনার প্রথম ধাপের এক-তৃতীয়াংশ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে, এবং তিন মাসের মধ্যে পুরো ধাপ শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
শেহাদে জানান, সেনাবাহিনী দক্ষিণ লেবাননে তাদের কার্যক্রম দ্বিগুণ গতিতে এগিয়ে নিচ্ছে। ইতোমধ্যে লিতানি নদীর দক্ষিণে ৪,২০০টিরও বেশি মিশন সম্পন্ন হয়েছে, ৭টি টানেল সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা হয়েছে এবং আরও ৪টি বন্ধের কাজ চলছে।
এছাড়া, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ১৭০১ নম্বর প্রস্তাব বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সব অ-রাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীর অস্ত্র সেনা কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে আনার কাজ শুরু হয়েছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র লেবাননের নিরাপত্তা খাতে ২৩ কোটি মার্কিন ডলার সহায়তা অনুমোদন করেছে, যার মধ্যে ১৯ কোটি ৫০ লাখ ডলার সেনাবাহিনীর জন্য বরাদ্দ। মন্ত্রী শেহাদে জানান, মার্কিন দূত মরগান অরটাগাসের কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় এই তহবিল অনুমোদন হয়েছে।
অন্যদিকে, ইউরোপীয় ইউনিয়নও লেবাননের প্রতি সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা বাড়ানোর অঙ্গীকার করেছে। বৃহস্পতিবার বৈরুতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইউসুফ রাজ্জি ও ইউরোপীয় কূটনীতিক চার্লস ফ্রিজ-এর মধ্যে বৈঠকে জাতীয় সেনা পুনর্গঠন, সংস্কার এবং শান্তি বজায় রাখার প্রচেষ্টা নিয়ে আলোচনা হয়।
ইইউ কর্মকর্তারা জানান, ২০২৬ সালে ইউনিফিল মিশন সমাপ্তির পর লেবানন যাতে নিজস্ব সক্ষমতায় নিরাপত্তা বজায় রাখতে পারে, সে জন্য তারা সহায়তা অব্যাহত রাখবে।
মন্ত্রী শেহাদে স্বীকার করেছেন, হিজবুল্লাহর হাতে থাকা অস্ত্রভাণ্ডারের অবস্থান এখনও অজানা, এবং দলটি এই তথ্য সেনাবাহিনীর সঙ্গে ভাগ করছে না। তিনি বলেন, “যতক্ষণ পর্যন্ত সব অস্ত্র রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে না আসে, লেবাননের পূর্ণ সার্বভৌমত্ব সম্ভব নয়।”
তিনি আরও জানান, ইসরায়েলি হামলা বন্ধের শর্ত হিসেবে তেলআবিব দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ দাবি করছে। এই পর্যায় শেষ হলে সেনাবাহিনী লিতানি নদীর উত্তরের অঞ্চলে অভিযান চালাবে।
লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালাম বৃহস্পতিবার ব্রিটিশ রাজনৈতিক পরিচালক ড. ক্রিশ্চিয়ান টার্নার এবং বৈরুতস্থ ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত হ্যামিশ কাউয়েল-এর সঙ্গে বৈঠকে ব্রিটিশ সহায়তা ও হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণে বিশেষ দূত নিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন।
এদিকে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাজ্জি অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাউন্সিলের সভাপতি চার্লস আরবিদ-এর নেতৃত্বে এক প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তারা আগামী ১৮–১৯ নভেম্বর অনুষ্ঠিতব্য “বৈরুত ওয়ান” বিনিয়োগ সম্মেলনের প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা করেন, যা প্রেসিডেন্ট আওনের পৃষ্ঠপোষকতায় অনুষ্ঠিত হবে।
রাজ্জি বলেন, “প্রবাসী লেবাননিদের বিনিয়োগই আমাদের অর্থনীতির পুনরুজ্জীবনের মূল চাবিকাঠি।”