কুয়ালালামপুর, ২৩ অক্টোবর : দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতা জোট আসিয়ান (ASEAN) এখন আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংহতি ও পারস্পরিক সংযোগ জোরদারে নতুন গতি আনছে। সদস্য রাষ্ট্রগুলো “আসিয়ান ভিশন ২০৪৫” বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে পরিকল্পনা ও চুক্তিগুলোকে বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দিতে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী দাতুক সেরি মোহাম্মদ হাসান।
আজ (বৃহস্পতিবার ) কুয়ালালামপুর কনভেনশন সেন্টার (KLCC)-এ আসিয়ান শীর্ষ সম্মেলন উপলক্ষে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম কেন্দ্র পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, আসন্ন ৪৭তম আসিয়ান শীর্ষ সম্মেলনে ৮০টিরও বেশি ফলপ্রসূ চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক (MoU) চূড়ান্ত ও ঘোষণার সম্ভাবনা রয়েছে। এটি আসিয়ান ব্লকের ভবিষ্যৎ ভিশন বাস্তবায়নের প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকারের প্রতিফলন।
“আমাদের লক্ষ্য হলো আসিয়ান ভিশন ২০৪৫ বাস্তবায়ন করা। মালয়েশিয়া এই ভিশনের নেতৃত্ব দেবে এবং আমরা ধাপে ধাপে আসিয়ান কমিউনিটি ২০৪৫ এজেন্ডা বাস্তবায়ন করব,” বলেন মোহাম্মদ হাসান।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ভিশন ২০৪৫-এর প্রথম ধাপে গুরুত্ব দেওয়া হবে আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধি, যার মধ্যে থাকবে অবকাঠামো উন্নয়ন, বাণিজ্য লজিস্টিকস ও ডিজিটাল সংহতি।
দ্বিতীয় ধাপে আসিয়ানের লক্ষ্য হবে সদস্য দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কার্যক্রম জোরদার করা, যাতে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জাপানের মতো ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্য অংশীদারদের ওপর অতিনির্ভরতা কমানো যায়।
“আমরা বাজার সম্প্রসারণ করতে চাই এবং নতুন সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করতে চাই। আসিয়ানকে একসঙ্গে এগিয়ে যেতে হবে, আঞ্চলিক শক্তিকে কেন্দ্র করে,” বলেন তিনি।
মোহাম্মদ হাসান আরও জানান, আসিয়ান উদীয়মান অর্থনৈতিক জোট ব্রিকস (BRICS) এর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী এবং ২০২০ সালের পর প্রথমবারের মতো আঞ্চলিক বিস্তৃত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব (RCEP) নিয়ে পুনরায় আলোচনা শুরু করা হবে।
এছাড়া, চীনের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক আরও মজবুত করতে আসিয়ান আসিয়ান ও চীন মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি তিন দশমিক শূন্য (FTA ৩.০) কাঠামো উন্নত করার পরিকল্পনা করছে।
“আমরা চীন ও আসিয়ান দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের প্রবাহ আরও গতিশীল করতে চাই। নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা না করে একসাথে এগোলে আসিয়ান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও শক্তিশালী কণ্ঠে কথা বলতে পারবে,” বলেন তিনি।
“এক দৃষ্টি, এক পরিচয়, এক কমিউনিটি” এই মূলমন্ত্রের ভিত্তিতে আসিয়ান ভিশন ২০৪৫ বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে ব্লকটি। মোহাম্মদ হাসান বলেন, “অন্তর্ভুক্তি ও টেকসই উন্নয়ন” এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হলেও আসিয়ান আরও ঐক্যবদ্ধ কাঠামোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
“আমরা এক কণ্ঠে কথা বলতে চাইলে আগে নিজেদের মধ্যে সামঞ্জস্য আনতে হবে। শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং অন্তর্ভুক্তি ও টেকসই উন্নয়নের দিক থেকেও,” তিনি মন্তব্য করেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, এই শীর্ষ সম্মেলনে তিমুর-লেস্তে-এর ১১তম সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্তি আসিয়ানের জন্য নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।
“আসিয়ান একসময় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বহিঃপ্রভাব থেকে সদস্য দেশগুলোকে রক্ষার জন্য গঠিত হয়েছিল, কিন্তু এখন এটি অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও যৌথ উন্নয়নের প্ল্যাটফর্মে রূপ নিয়েছে,” বলেন তিনি।
আসিয়ান চেয়ারম্যানশিপ ২০২৫-এর নেতৃত্বে মালয়েশিয়া “অন্তর্ভুক্তি ও টেকসই উন্নয়ন” থিমকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এ বছর ২৬ থেকে ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত KLCC-তে অনুষ্ঠিত হবে ৪৭তম আসিয়ান শীর্ষ সম্মেলন ও সংশ্লিষ্ট বৈঠকগুলো।
এই সম্মেলনকে আসিয়ানের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ বৈঠক হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
মালয়েশিয়া এর আগে ১৯৭৭, ১৯৯৭, ২০০৫ ও ২০১৫ সালে আসিয়ানের সভাপতিত্ব করেছে। এটি হবে পঞ্চমবারের মতো দেশটির নেতৃত্ব গ্রহণ।
পরবর্তী বছর ২০২৬ সালে ফিলিপাইনস আসিয়ানের চেয়ারম্যানশিপ গ্রহণ করবে।
“এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আসিয়ানের নেতৃত্ব দিতে পেরে মালয়েশিয়া গর্বিত। আমাদের লক্ষ্য হলো অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি, ডিজিটাল রূপান্তর ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা,” উপসংহারে বলেন মোহাম্মদ হাসান।