বাংলাদেশের সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পরিকল্পিতভাবে মেরুদণ্ডহীন করার একটি কঠিন ষড়যন্ত্র চলছে, এমন অভিযোগ উঠছে রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একাংশের কাছ থেকে। তাদের মতে, দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নষ্ট করে বাংলাদেশকে একটি সম্ভাব্য গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, এবং এই পরিকল্পনার নেপথ্যের কারিগর হিসেবে সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মোহাম্মদ ইউনূসকে দায়ী করা হচ্ছে।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে রক্তের ত্যাগে এবং মানুষের দীর্ঘ শোষণ-নিপীড়ন থেকে মুক্তির মাধ্যমে। মহান আল্লাহর অশেষ কৃপায় অর্জিত এই স্বাধীনতাকে বিশ্বের অধিকাংশ দেশ স্বীকৃতি দিলেও, কিছু প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের রাষ্ট্র সে সময় বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে দ্বিধা প্রকাশ করেছিল। বিশেষ করে একটি নতুন মুসলিম রাষ্ট্রের উদ্ভবকে কেউ কেউ তাদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থের বিরুদ্ধে মনে করেছিল।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীন বাংলাদেশকে সহজে মেনে নিতে পারেনি। দক্ষিণ এশিয়ায় নিজেদের আধিপত্য ও চীনের উত্থান ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই এই অঞ্চলে বিভিন্ন শক্তিকে অর্থ, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়ে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করেছে, এমন অভিযোগও বহুদিনের।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট সরকারপ্রধান শেখ হাসিনার পতনের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রশিক্ষিত হিসেবে সমালোচিত ড. ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টার আসনে বসানো হয়। তার শপথ গ্রহণের পর থেকেই দেশে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিস্তারের কর্মকাণ্ড অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে,এমন অভিযোগ রয়েছে।
সমালোচকদের দাবি, ভারতীয় আধিপত্য থেকে মুক্ত হওয়ার পর যখন দেশের মানুষ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে চাইছিল, ঠিক তখনই বাংলাদেশকে স্থায়ীভাবে মার্কিন প্রভাববলয়ে টেনে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ড. ইউনূসকে ব্যবহার করে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা ও দক্ষিণপন্থী শক্তি এই অঞ্চলে নিজেদের স্বার্থ সুদৃঢ় করার চেষ্টা করছে। এর অংশ হিসেবে বাংলাদেশে ভবিষ্যৎ সামরিক ঘাঁটির সম্ভাবনাও আলোচনায় আসছে।
সমালোচকরা আরও বলছেন, সেনাবাহিনীকে জনগণের সামনে দাঁড় করিয়ে দুর্বল করার একটি সুপরিকল্পিত উদ্যোগ চলছে। বিদেশী শক্তির মদদে যেমন ২০০৯ সালের পিলখানা গণহত্যার মাধ্যমে সামরিক বাহিনীর মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, তেমনি এখন বিদেশি স্বার্থে কাজ করা একটি রাজনৈতিক বলয় একই কৌশল প্রয়োগ করছে।
৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের নেতৃত্বে সামরিক বাহিনী আবার শৃঙ্খলায় ফেরার চেষ্টা করছে, কিন্তু একই সময়ে বিদেশি প্রভাবশালী রাষ্ট্রের স্বার্থে কাজ করা রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতার লোভে নতজানু হয়ে পড়ছে, এমন অভিযোগও রয়েছে।
বলা হচ্ছে, রাজনৈতিক দলগুলোর একটি অংশ দেশের স্বার্থভিত্তিক অবস্থান না নিয়ে বরং বিদেশি শক্তির তুষ্টিকরণের লক্ষ্যে ড. ইউনূসের সিদ্ধান্তকে সমর্থন দিচ্ছে। অভিযোগ, ৫৬ হাজার বর্গমাইলের ভূখণ্ডে বিদেশি সামরিক ঘাঁটি প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও তারা উপেক্ষা করছে।
কিছু বিশ্লেষকের মতে, যদি রাজনৈতিক দলগুলো সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একটি স্থিতিশীল জনগণের সরকার গঠন করতে ব্যর্থ হয়, তবে ২০২৬ সালের শুরুতেই বাংলাদেশ গৃহযুদ্ধের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
ইতোমধ্যে প্রশাসনের বহু প্রভাবশালী ব্যক্তিও অর্থ ও ক্ষমতার লোভে বিদেশি স্বার্থে নিজেদের সঁপে দিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা সামরিক বাহিনীকে জাতীয় স্বার্থে সক্ষমতা বৃদ্ধি, জনগণের নিরাপত্তা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষার ভূমিকা আরও দৃঢ়ভাবে পালন করতে হবে। তা নাহলে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ পরাশক্তিগুলোর যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।