পশ্চিম তীরের শান্ত পাহাড়ে যখন হেমন্তের সূর্য আলতো করে ঝরে পড়ে, তখন প্যালেস্টিনীয় কৃষকরা তাদের সবচেয়ে প্রিয় মৌসুম — জলপাই ফল তোলার সময় — উদ্যাপন করেন। শত শত বছর ধরে এই জলপাই গাছ তাদের জীবনের প্রতীক, তাদের মাটির সঙ্গে বন্ধনের গল্প। কিন্তু এ বছর সেই গল্পে এসেছে অন্ধকার অধ্যায়।
বছরের এই সময়টিতে যখন পরিবার-পরিজন নিয়ে সবাই মাঠে যায়, তখনও অনেক কৃষক ফিরে এসেছেন চোখে জল নিয়ে। কারণ, তাদের বাগানে আর গাছ নেই — কেটে ফেলেছে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা। কেউ কেউ দেখেছেন, শত বছরের পুরোনো জলপাই গাছগুলো আগুনে পুড়ছে, ধোঁয়ার সঙ্গে উড়ে যাচ্ছে জীবিকার আশা।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এ বছরই পশ্চিম তীরে অন্তত ১৫০টির বেশি হামলার ঘটনা ঘটেছে। বসতি স্থাপনকারীরা শুধু গাছ কেটে দেয়নি, অনেক জায়গায় কৃষকদের ওপর হামলাও চালিয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, সেনাদের সামনেই এসব ঘটছে, অথচ কেউ বাধা দেয় না।
৬০ বছর বয়সী এক কৃষক, ইউসুফ হামাদ, কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললেন,
“আমার বাবা এই গাছ লাগিয়েছিলেন, আমি তার ছায়ায় বড় হয়েছি। এখন দেখছি, গাছ নেই, ফল নেই — শুধু ছাই আর ভয়।”
জলপাই প্যালেস্টিনীয় সংস্কৃতির প্রাণ। এটি শুধু একটি ফসল নয়, এটি পরিবার, ইতিহাস, এবং টিকে থাকার গল্প। একটি গাছ ফল দিতে শুরু করতে দশ বছর লাগে — কিন্তু তা ধ্বংস করতে লাগে মাত্র কয়েক মিনিট।
অন্যদিকে, ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বলছেন, “নিরাপত্তার স্বার্থে” কিছু এলাকায় প্রবেশ সীমিত করা হয়েছে। কিন্তু প্যালেস্টিনীয় কৃষকদের মতে, এই অজুহাতই তাদের জমি দখল করার উপায় হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
জাতিসংঘ এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই পরিস্থিতিকে “সংগঠিত সহিংসতা” হিসেবে বর্ণনা করেছে। তারা বলছে, এটি কেবল একটি ফসলের মৌসুম নয়, বরং একটি জাতির অস্তিত্বের সংগ্রাম।
এক তরুণ কৃষক, আমির নাসের, যিনি সদ্য বিয়ে করেছেন, বললেন—
“আমি চেয়েছিলাম আমার সন্তানকে এই গাছের নিচে খেলতে দেখতে। এখন জানি না, সে এই জমিতে ফিরে আসতে পারবে কিনা।”
পশ্চিম তীরের সেই পাহাড়গুলো আজো বাতাসে কাঁদে — সেখানে প্রতিটি শুকনো পাতায় লুকিয়ে আছে এক একটি অশ্রু, প্রতিটি জলপাই গাছে খোদাই হয়ে আছে দখল, ধ্বংস আর প্রতিরোধের কাহিনি।
জলপাইয়ের রঙ সবুজ, কিন্তু পশ্চিম তীরে এখন তা রাঙা হয়ে উঠেছে রক্তে আর অশ্রুতে। তবুও কৃষকরা বিশ্বাস হারাননি — তারা জানেন, একদিন শান্তির বৃষ্টি আবার নামবে, আর সেই বৃষ্টিতে নতুন করে জন্ম নেবে জীবনের সবুজ জলপাই।