১১ জানুয়ারি : ইরানে সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলার প্রেক্ষাপটে দেশটির শেষ সম্রাটের নির্বাসিত ছেলে রেজা পাহলভি রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাব্য মুখ হিসেবে নিজেকে সামনে আনছেন। তবে কয়েক দশক ধরে দেশের বাইরে অবস্থান এবং অভ্যন্তরীণভাবে বিভক্ত জনমত দুটিই তার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
৬৫ বছর বয়সী রেজা পাহলভি ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের আগেই ইরান ছাড়েন। ওই বিপ্লবেই তার বাবা মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভির শাসনের অবসান ঘটে। যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত জীবন থেকে তিনি ধারাবাহিকভাবে বিক্ষোভকারীদের সমর্থনে বার্তা দিচ্ছেন এবং প্রায় পাঁচ দশক ধরে চলা ইরানের ধর্মীয় শাসনের অবসানের আহ্বান জানাচ্ছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত সাম্প্রতিক ভিডিও বার্তায় পাহলভি ইসলামী প্রজাতন্ত্রের ‘জীর্ণ ও ভঙ্গুর দমনমূলক ব্যবস্থাকে’ ভেঙে দেওয়ার অঙ্গীকার করেন। তিনি রাজনৈতিক স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং গণতান্ত্রিক শাসনের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
সাম্প্রতিক বিক্ষোভের মূল কারণ ইরানের গভীর অর্থনৈতিক সংকট। দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং গত জুনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলায় ঘটা ১২ দিনের সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভকারীরা লাগামহীন মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব ও জীবনযাত্রার মানের অবনতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।
কিছু বিক্ষোভকারী “শাহ দীর্ঘজীবী হোন” স্লোগান দিলেও অনেকেই রাজতন্ত্রে ফেরার ধারণা প্রত্যাখ্যান করছেন। তাদের দাবি—ধর্মীয় শাসন ও রাজতান্ত্রিক উত্তরাধিকার, দুটির বাইরে একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। উত্তর ইরানের ২৭ বছর বয়সী আজাদেহ অনলাইনে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, “আমরা পাহলভিদের শাসন দেখেছি, সেটি ব্যর্থ হয়েছিল। এখন সময় গণতন্ত্রের।”
১৯৭৯ সালের বিপ্লবে যেখানে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি একক নেতৃত্বে বিরোধী আন্দোলনকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন, সেখানে বর্তমান আন্দোলনে তেমন কোনো একক নেতা নেই। বিরোধী শক্তি এখনো বিভক্ত। এই বাস্তবতা স্বীকার করলেও পাহলভি বলেছেন, তিনি একটি রূপান্তরকালীন প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দিতে প্রস্তুত—তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে ইরানের জনগণই।
গত জুনে দেওয়া এক ভাষণে তিনি বলেন, “শান্তির একমাত্র পথ হলো একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক ইরান। আমি আজ আমার সহদেশবাসীর কাছে নিজেকে সমর্পণ করছি, যেন আমরা শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক রূপান্তরের পথে এগোতে পারি।”
ইন্টারনেট বন্ধ ও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে ইরানের ভেতরে পাহলভির প্রকৃত জনসমর্থন নির্ধারণ করা কঠিন। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে বসবাসকারী ইরানি প্রবাসীদের একটি অংশের মধ্যে তিনি উল্লেখযোগ্য সমর্থন পাচ্ছেন।
১৯৬০ সালে জন্ম নেওয়া রেজা পাহলভি মাত্র সাত বছর বয়সে যুবরাজ ঘোষিত হন। বিপ্লবের আগে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান এবং পরে যুদ্ধবিমান চালকের প্রশিক্ষণ নেন। তিনি দাবি করেছেন, ১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধে অংশ নেওয়ার প্রস্তাব দিলেও তৎকালীন ইসলামী সরকার তা প্রত্যাখ্যান করে। পরবর্তীতে তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞান অধ্যয়ন করেন এবং নির্বাসন থেকেই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় তিনি বিতর্কের মুখে পড়েন। তার মতে, এসব হামলা সরকারের দমনক্ষমতা দুর্বল করেছে। তবে ইরান বরাবরই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
দৃশ্যমান উপস্থিতি সত্ত্বেও পশ্চিমা সরকারগুলো এখনো তাকে প্রকাশ্যে সমর্থন দেয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি ইরানি জনগণের আন্দোলনের অধিকার সমর্থন করেন, তবে পাহলভির সঙ্গে সাক্ষাৎ উপযুক্ত হবে কি না—সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন।
বিক্ষোভ চলমান থাকায় এবং সরকারের ওপর চাপ বাড়তে থাকায়, রেজা পাহলভির নতুন করে সামনে আসা ইরানের জনগণের গভীর অসন্তোষের পাশাপাশি একটি বড় প্রশ্নও সামনে এনেছে, বিভক্ত বিরোধী শক্তিকে একত্রিত করে কার্যকর রাজনৈতিক বিকল্প গড়ে তুলতে আদৌ কেউ পারবেন কি না।







