ঢাকা: মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর নামে অবৈধ অর্থপাচার ও মানবপাচারের অভিযোগে তিন সাবেক সংসদ সদস্যসহ ৩৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
বৃহস্পতিবার (২৮ আগস্ট) রাতে সিআইডির আর্থিক অপরাধ দমন শাখার কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোনিরুজ্জামান রাজধানীর বনানী থানায় এ মামলা দায়ের করেন (মামলা নং: ৩৫/২০২৫)।

সিআইডির প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, ২০১৬ সালের আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের মে পর্যন্ত প্রায় ১৭৫ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। এই অর্থ লেনদেন হয় রাজধানীর বনানীতে অবস্থিত ফাইভ এম ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড এর মাধ্যমে, যা সাবেক সংসদ সদস্য (ফেনী-৩) অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর মালিকানাধীন।
অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য বেনজির আহমেদ, নিজাম উদ্দিন হাজরী, প্রভাবশালী আদম ব্যবসায়ী রুহুল আমিন স্বপন, সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের স্ত্রী কাশ্মীরী কামাল, জেনারেল মাসুদের স্ত্রী জেসমিন মাসুদ ও মেয়ে তাসনিয়া মাসুদসহ একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি।
সূত্র মতে, ভিসা ফি: প্রায় ৩,৫০,০০০ টাকা, মেডিকেল ফি: প্রায় ১৫,০০০ টাকা,পুলিশ ক্লিয়ারেন্স ফি: প্রায় ১০,০০০ টাকা। সব মিলিয়ে একজন শ্রমিকের কাছ থেকে গড়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সব মিলিয়ে একজন শ্রমিকের কাছ থেকে গড়ে প্রায় ৩.৭৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। মালয়েশিয়ান মুদ্রায় (রিংগিত) এ পরিমাণ দাঁড়ায় ১৫ থেকে ২০ হাজার।
অপরদিকে, এ কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রায় ৪ লাখ ৮০ হাজার শ্রমিক মালয়েশিয়ায় পাঠানো হয়। তাদের অনেকে প্রতিশ্রুত চাকরি পাননি; অনেককে আবার কম বেতন কিংবা বিনা বেতনে কাজ করতে হয়েছে। ফলে হাজারো শ্রমিক চরম ভোগান্তি ও মানবেতর জীবনে পড়েছেন।

মামলার পর সিআইডি অভিযুক্তদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে কয়েক কোটি টাকা জব্দ করেছে। সিন্ডিকেটের মূল হোতা হিসেবে চিহ্নিত রুহুল আমিন স্বপনের প্রায় ৫০০ কোটি টাকার সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।
তবে স্বপন গণমাধ্যমকে বলেন, “এ পদক্ষেপ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আমাদের সম্পত্তি অন্যায়ভাবে দখল করা হচ্ছে।”
সিআইডি জানিয়েছে, অভিযুক্তরা শ্রমিক পাঠানোর নামে কোটি কোটি টাকা হুন্ডি ও অবৈধ ব্যাংক চ্যানেলের মাধ্যমে বিদেশে পাচার করেছেন। এটি মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ (সংশোধিত ২০১৫) ও মানবপাচার প্রতিরোধ আইন ২০১২ অনুযায়ী গুরুতর অপরাধ।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শিগগিরই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে চার্জশিট আদালতে দাখিল করা হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই চক্র ভাঙতে হলে মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত দালাল ও হুন্ডি ব্যবসায়ীদের সনাক্ত করে যৌথভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে। একইসাথে মালয়েশিয়ার রিক্রুটিং এজেন্সি ও কোম্পানিগুলো যারা বাংলাদেশি শ্রমিক সংগ্রহ করেছে, তাদের চিহ্নিত করে সাক্ষী বানালে আদালতে শক্ত প্রমাণ উপস্থাপন করা সম্ভব হবে।
একজন শ্রমবাজার বিশেষজ্ঞ বলেন, বাংলাদেশি শ্রমিক পাঠানোর জন্য পূর্বে যেই প্রক্রিয়া অবলম্ভন করা হয়েছে,সেটি বাংলাদেশের সাথে অবিচার করা হয়েছে, কারণ মালয়েশিয়া ১৪টি সোর্স কান্ট্রির বাংলদেশ ছাড়া আর কোনো দেশের ক্ষেত্রে সিন্ডিকেট নেই ,
“মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে শুধু বাংলাদেশের জন্যই সিন্ডিকেট চালু করা হয়েছিল। এটি একটি প্রভাবশালী মানবপাচার ও অর্থপাচার চক্রের কাজ। এখনই সময় বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া সরকারের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপের মাধ্যমে এই চক্রকে ভেঙে দেওয়া।”