শার্ম আল-শেখ, মিসর | ৭ অক্টোবর : গাজা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে প্রণীত ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০ দফা শান্তি প্রস্তাব বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনার সূচনা হয়েছে মিসরের পর্যটন নগরী শার্ম আল-শেখে।
মিসরীয় ও ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা বিবিসিকে জানিয়েছেন, আলোচনার মূল লক্ষ্য হলো এমন “মাঠ পর্যায়ের শর্ত তৈরি করা,” যার মাধ্যমে ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্তির বিনিময়ে বিপুল সংখ্যক ফিলিস্তিনি বন্দির মুক্তি নিশ্চিত করা যেতে পারে।
আলোচনায় মধ্যস্থতা করছেন মিসর ও কাতারের কর্মকর্তারা, যারা ইসরায়েলি ও হামাস প্রতিনিধিদলের সঙ্গে পৃথকভাবে বৈঠক করছেন। উপস্থিত রয়েছেন মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ, ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার, এবং কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুর রহমান আল থানি।
এই আলোচনা এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে দক্ষিণ ইসরায়েলে হামলার দুই বছর পূর্তি। ওই হামলায় প্রায় ১,২০০ ইসরায়েলি নিহত হন এবং ২৫১ জন জিম্মি করা হয়। পরবর্তীতে ইসরায়েল গাজায় ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে, যেখানে এখন পর্যন্ত ৬৭,০০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে হামাস-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দাবি।
ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু-এর মধ্যে সমঝোতাকৃত ২০ দফা শান্তি প্রস্তাবে তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি, ৪৮ জন জিম্মির মুক্তি (যার মধ্যে প্রায় ২০ জন জীবিত বলে ধারণা), এবং শতাধিক ফিলিস্তিনি বন্দির বিনিময় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
চুক্তি কার্যকর হলে মানবিক সহায়তা অবিলম্বে গাজায় প্রবেশের অনুমতি পাবে বলে প্রস্তাবে উল্লেখ রয়েছে। একই সঙ্গে হামাসকে গাজা প্রশাসন থেকে বহিষ্কার করা হবে এবং ভবিষ্যতে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের সম্ভাবনা খোলা থাকবে।
শুক্রবার এক বিবৃতিতে হামাস জানায়, তারা আংশিকভাবে প্রস্তাবটি মেনে নিয়েছে এবং “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রস্তাব অনুযায়ী সকল ইসরায়েলি বন্দিকে (জীবিত ও মৃত) বিনিময় সূত্রে মুক্তি দিতে রাজি,” তবে প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ হলে।
তবে হামাস এখনো নিরস্ত্রীকরণ (disarmament) ও গাজা শাসন থেকে সম্পূর্ণ সরে যাওয়ার শর্তগুলো মেনে নেয়নি। সংগঠনটি প্রস্তাব করেছে, গাজার প্রশাসন আরব ও ইসলামিক বিশ্বের সমর্থনে গঠিত একটি স্বাধীন প্রযুক্তিনির্ভর ফিলিস্তিনি প্রশাসনের হাতে তুলে দেওয়া যেতে পারে।
অন্যদিকে নেতানিয়াহু বলেন, “চুক্তিতে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের কথা লেখা নেই। আমরা সবসময় এর বিরোধিতা করেছি এবং এখনো করব।”
ট্রাম্পের শান্তি উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ (PA), যারা এটিকে “সৎ ও দৃঢ় প্রচেষ্টা” বলে অভিহিত করেছে। ইরান, যা দীর্ঘদিন হামাসের অন্যতম প্রধান মিত্র, তারাও এবার অপ্রত্যাশিতভাবে প্রস্তাবটির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।
ইউরোপ ও আরব বিশ্বের অনেক নেতাও এই উদ্যোগকে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের অবসানের সুযোগ হিসেবে দেখছেন।
ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, “সব পক্ষকে দ্রুত এগিয়ে যেতে হবে,” এবং তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে প্রথম ধাপ — জিম্মি বিনিময় — এই সপ্তাহেই সম্পন্ন হতে পারে।
তবে শান্তি আলোচনা শুরু হলেও গাজায় ইসরায়েলি বিমান ও স্থল অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
হামাস-নিয়ন্ত্রিত সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল বলেন, “গত চার সপ্তাহ ধরে কোনো সাহায্যের ট্রাক গাজা সিটিতে প্রবেশ করতে পারেনি। এখনো এমন অনেক এলাকা রয়েছে, যেখান থেকে মৃতদেহ উদ্ধার সম্ভব হচ্ছে না।”
ইসরায়েলি বাহিনী গাজার উত্তরাঞ্চল থেকে জনগণকে দক্ষিণের “মানবিক এলাকা”-তে সরিয়ে নিতে বলেছে। তবে শত-সহস্র মানুষ এখনো সেখানে রয়ে গেছে। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী সতর্ক করে বলেছেন, “যারা থাকবে, তারা সন্ত্রাসী বা সন্ত্রাসে সহযোগী হিসেবে বিবেচিত হবে।”
হামাসের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ২১ ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৯৬ জন আহত হয়েছে।
স্বাধীন সাংবাদিকদের গাজায় প্রবেশের অনুমতি না থাকায় উভয় পক্ষের দাবির সত্যতা যাচাই করা কঠিন।
বিশ্লেষকদের মতে, শার্ম আল-শেখের এই আলোচনা গাজা যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।
যদি ট্রাম্পের শান্তি প্রস্তাব বাস্তবায়িত হয়, তবে এটি শুধু যুদ্ধের অবসানই নয় , বরং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামোতেও এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের সূচনা ঘটাতে পারে।