আন্তর্জাতিক ডেস্ক : বিশ্লেষক ও কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ইরানের বর্তমান সরকারের পতন ঘটলে তা শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং মধ্যপ্রাচ্য, বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি বাজারে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একাংশের ধারণা, ইরানে ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তা কৌশলগত সুযোগ হিসেবে নিতে পারে। তাদের সম্ভাব্য লক্ষ্য হতে পারে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা, ব্যালিস্টিক ও সুপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন অবকাঠামো এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC)-এর শীর্ষ নেতৃত্ব।
পশ্চিমা দেশ ও ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের সামরিক ও পরমাণু সক্ষমতাকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। বিশ্লেষকদের মতে, সরকার পতনের পর এসব সক্ষমতা স্থায়ীভাবে ধ্বংস করার চেষ্টা চালানো হতে পারে।
জ্বালানি নিরাপত্তাও এই সমীকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল ও গ্যাস রিজার্ভের অধিকারী ইরান। দেশটিতে অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে বা বিদেশি শক্তির প্রভাব বাড়লে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে, যার প্রভাব পড়বে এশিয়া ও ইউরোপের অর্থনীতিতে।
বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করছেন, রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়লে ইরান গৃহযুদ্ধের দিকে যেতে পারে। সিরিয়া, ইয়েমেন ও লিবিয়ার মতো উদাহরণ টেনে তারা বলছেন, বহুমুখী অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও বিদেশি হস্তক্ষেপ দেশটিকে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে। ইরানের মতো জনবহুল ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দেশে এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে তার প্রভাব হবে বহুগুণ বেশি।
সিরিয়ার দুর্বলতার পর ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ রাজনীতিতে ইরান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। আরব উপসাগরীয় অনেক দেশের বিপরীতে, ইরান পশ্চিমা শক্তির সঙ্গে আপোষ না করার নীতিতে অটল থেকেছে, যা তাকে একই সঙ্গে প্রভাবশালী ও বিতর্কিত করে তুলেছে।
কঠোর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরান প্রযুক্তি, সামরিক সক্ষমতা, পরমাণু বিজ্ঞান, চিকিৎসা ও আত্মনির্ভরতার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শাসনামলে দেশটি নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তুলেছে এবং উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে অগ্রসর হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত।
ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার পতন হলে চীন, রাশিয়া, ভারত ও তুরস্কের মতো দেশগুলিও ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। এসব দেশের সঙ্গে ইরানের জ্বালানি, বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও সামরিক সহযোগিতা গভীরভাবে জড়িত। ফলে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা আঞ্চলিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
কিছু নিরাপত্তা বিশ্লেষকের মতে, যদি ইরানের নেতৃত্ব নিজেদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে দেখতে পায়, তবে তারা শেষ প্রতিরোধ হিসেবে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে সরাসরি বড় ধরনের যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়বে।
বিশ্লেষকদের অভিন্ন মত হলো, ইরানের সরকার পতন কেবল একটি দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়; বরং এটি মধ্যপ্রাচ্য, বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক শক্তির ভারসাম্যে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।