বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেয়া সাক্ষাৎকারে শিক্ষার্থীরা দ্রুত নির্বাচনের পরিবর্তে এই জায়গায় সংস্কার আনতে নতুন দল গঠনের চিন্তাভাবনা কথা জানিয়েছেন। এক প্রতিবেদনে সংস্থাটি বলছে, ছাত্র-জনতার আন্দোলনের নেতাদের আশা, শেখ হাসিনা যেভাবে গত ১৫ বছর দেশ শাসন করেছেন তার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতেই এই দল আনা প্রয়োজন।
ছাত্র বিক্ষোভ ও গণঅভ্যুত্থানের মুখে গত ৫ আগস্ট দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা। পরে বৃহস্পতিবার (০৮ আগস্ট) ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের শপথ নেন ১৪ জন উপদেষ্টা। নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে নির্বাচন দিতে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছে প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। তবে শেখ হাসিনা সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার আন্দোলনে অংশ নেয়া শিক্ষার্থীরা ভাবছেন ভিন্ন কিছু।
মূলত গত জুন মাসের মাঝামাঝি থেকে শুরু হয় কোটা সংস্কার আন্দোলন। একপর্যায়ে তা সরকার পতনের এক দফা আন্দোলনে রূপ নেয়। জুলাই মাসে বিক্ষোভ দমনে শেখ হাসিনা সরকার ব্যাপক সহিংসতার আশ্রয় নিলে প্রায় ৩০০ জন নিহত হন। ১৯৭১ সালের পর স্বাধীন বাংলাদেশে এমন বড় আন্দোলনের ইতিহাস নেই। বিশ্লেষকেরা এই আন্দোলনকে জেন-জির আন্দোলন বলেও ব্যাপক প্রশংসা করছেন।
গত তিন দশকের বেশির ভাগ সময় বাংলাদেশ শাসন করেছে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ বা তার প্রতিদ্বন্দ্বী বেগম খালেদা জিয়ার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এই দুই নেতার বয়সই ৭০ বছরের বেশি। সর্বশেষ আন্দোলনের ছাত্রনেতারা বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই দুই অবসান ঘটাতে একটি রাজনৈতিক দল গঠনের বিষয়ে আলোচনা করছেন বলে জানিয়েছেন ছাত্রদের পক্ষ থেকে সরকার, শিক্ষক, অধিকারকর্মী ও সামাজিক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে যোগাযোগের লক্ষ্য গঠিত লিয়াজোঁ কমিটির সভাপতি মাহফুজ আলম।
রয়টার্সকে ২৬ বছর বয়সী এই তরুণ বলেন, আগামী এক মাসের মধ্যেই এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে। তবে দল গঠনের আগে ছাত্র আন্দোলনের নেতারা ভোটারদের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের পরামর্শ নিতে চান। মাহফুজ আলম বলেন, ‘দুই রাজনৈতিক দলের প্রতি মানুষ সত্যিই ক্লান্ত। আমাদের ওপর তাদের (সাধারণ মানুষের) আস্থা আছে।’
তাহমিদ চৌধুরী নামে অপর এক সমন্বয়ক জানান, তাদের একটি রাজনৈতিক দল গঠন করার ‘উচ্চ সম্ভাবনা’ আছে। তারা এখনো নিজেদের কর্মসূচি নিয়ে কাজ করছে। আর যদি দল গঠন করা হয়, তবে ধর্মনিরপেক্ষতা–বাক্স্বাধীনতাকে দলের মূলনীতি করা হবে। তিনি বলেন, ‘দুই দলের প্রাধান্য ভাঙতে এ ছাড়া আমাদের সামনে দ্বিতীয় আর কোনো পরিকল্পনা নেই।’
অন্যদিকে, অন্তর্বর্তী সরকারে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেছেন, ছাত্ররা তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্য নিয়ে তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করেনি। তিনি বলেন, ‘তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হতে যাচ্ছে। কারণ, আমরা মূলত তরুণ প্রজন্মকে রাজনীতি থেকে বাইরে রেখেছিলাম।’ ছাত্ররা নতুন দল গঠন করেছেন কিনা জানতে চাইলে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেন, তাদের সঙ্গে এ নিয়ে কথা হয়নি। তবে, রাজনৈতিক ধারা পরিবর্তন হবে। কেননা এতদিন এই রাজনীতি থেকে তরুণদের বাদ রাখা হতো।
ইতোমধ্যে শেখ হাসিনা সরকারের সময় নিয়োগ পাওয়া প্রধান বিচারপতি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ও পুলিশ প্রধানের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস একজন অর্থনীতিবিদ। ‘ক্ষুদ্রঋণ’ ইস্যুতে তিনি বিশ্বে বেশ আলোচিত। এমনকি তার এই থিওরি কাজে লাগিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অর্থনীতিতে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে, যিনি যা চান তা বাংলাদেশে করতে পারবেন কিনা তা নিয়ে বেশ সংশয় রয়েছে।
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে প্রায় ৩০ জনের সঙ্গে কথা বলেছে রয়টার্স। এর মধ্যে শিক্ষার্থী ছাড়াও রাজনৈতিক দলের নেতা ও বিশ্লেষক রয়েছেন। শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় রয়টার্সকে বলেন, ‘রাজনৈতিক দল কোথাও যাচ্ছে না। তাদের উৎপাটন করা যাবে না। এখন হোক কিংবা পরে, আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপিই ক্ষমতায় আসবে। আমাদের সহযোগিতা ছাড়া, আমাদের সমর্থকদের ছাড়া কেউ বাংলাদেশে স্থিতিশীল অবস্থা আনতে পারবে না।’