ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান মোতায়েনের প্রতিযোগিতা এখন আর কেবল ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নয়, বরং এটি এখন বাস্তব ও উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এক প্রতিযোগিতা। ২০৩০-এর দশক ও তার পরবর্তী সময়ের কৌশলগত ভারসাম্য অনেকটাই নির্ভর করবে এই প্রতিযোগিতার বিজয়ী ও পরাজিতদের ওপর। নানা উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রকল্প ও রাজনৈতিক বিভাজনের ভিড়ে সুস্পষ্ট লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে একটি দেশ, আর তা বিশ্বজুড়ে নজরও কাড়ছে— তুরস্কের নিজস্ব যুদ্ধবিমান ‘কান’।
সংবাদমাধ্যম বলছে, ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান নিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রতিযোগিতা যখন জোরদার, তখন তুরস্কের নিজস্ব ‘কান’ যুদ্ধবিমান প্রকল্প নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে। অত্যাধুনিক তুর্কি এই ফাইটার জেট এশিয়ার আকাশশক্তির সমীকরণ বদলে দিতে পারে। এই আস্থার পেছনে অবশ্য যথেষ্ট কারণও রয়েছে। ‘কান’ প্রথমে পঞ্চম প্রজন্মের প্রকল্প হিসেবে শুরু হলেও এখন এর ষষ্ঠ প্রজন্মের মডেল উন্মোচিত হয়েছে।
বর্তমানে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট প্রতিযোগিতাপূর্ণ হলেও ভারসাম্যহীন। যুক্তরাষ্ট্র তাদের ‘নেক্সট জেনারেশন এয়ার ডমিন্যান্স’ (এনজিএডি) কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। ইউরোপ আবার বিভক্ত। ফ্রান্স-জার্মানি-স্পেনের ‘ফিউচার কমব্যাট এয়ার সিস্টেম’ (এফসিএএস) এবং যুক্তরাজ্য-ইতালি-জাপানের ‘গ্লোবাল কমব্যাট এয়ার প্রোগ্রাম’ (জিসিএপি) আলাদা পথে হাঁটছে।
তবে প্রতিযোগিতা মানেই স্থিতিশীলতা নয়। ইউরোপের ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান প্রকল্পগুলো কাঠামোগত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। শিল্পখাতে কাজের ভাগাভাগি, বাজেট সংকট এবং একাধিক দেশ ও সরকারের প্রতিরক্ষা অগ্রাধিকার সমন্বয়ের জটিলতা প্রকল্পগুলোকে জটিল পরিস্থিতির মুখে ফেলেছে। খবরে বলা হচ্ছে, ইতালি, যুক্তরাজ্য ও জাপান এখন জার্মানিকে জিসিএপিতে যুক্ত করার চেষ্টা করছে, যদিও বার্লিন এখনও এফসিএএস প্রকল্পের অংশ হিসেবেই আছে। আর এতে করে ইউরোপীয় আকাশশক্তি পরিকল্পনায় সমন্বয়ের অভাবই স্পষ্ট হচ্ছে।
জাপানও এক ধরনের সন্ধিক্ষণে রয়েছে। জিসিএপি উন্নত প্রযুক্তি ও ন্যাটো অংশীদারিত্বের সুযোগ দিলেও এখানে জটিলতা কম নয়। এ সময় জার্মানি বা সৌদি আরবকে যুক্ত করলে শাসনব্যবস্থার জটিলতা বাড়তে পারে। ২০৩৫ সালে পরিষেবায় যুক্ত হওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে জিসিএপি, ফলে এখানে নতুন অংশীদার নেয়ার সময়সীমা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে ‘কান’-এর অগ্রযাত্রা বেশ সুশৃঙ্খল। তুরস্ক নতুন প্রোটোটাইপ উন্মোচন করেছে, দেশটি ইতোমধ্যেই ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে ৪৮টি বিমান কেনার চুক্তি করেছে এবং পাকিস্তানের সঙ্গে যৌথ উৎপাদনের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। সৌদি আরবের অংশগ্রহণ নিয়ে আলোচনাও রয়েছে চূড়ান্ত পর্যায়ে।
এটি কেবল কূটনৈতিক সক্রিয়তার ফল নয়, বরং ভিন্ন ভিন্ন কৌশলগত সংস্কৃতির দেশগুলোর মধ্যে ‘কান’-এর সক্ষমতার ওপর আস্থার প্রতিফলন।
খবরে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় মিত্রদের তুর্কি ও পাকিস্তানি যুদ্ধবিমান কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে। তবুও আলোচনা চলছে।
ভূরাজনৈতিক চাপের মধ্যেও এই স্থিতিশীলতা দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্বে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন প্রত্যাশী দেশগুলোর কাছে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বহু দেশ এখন আর তাদের প্রতিরক্ষা নীতি নির্ধারণে পুরোপুরি ওয়াশিংটনের নির্দেশনার ওপর নির্ভর করতে রাজি নয় বলে ইঙ্গিতও এতে রয়েছে।