শিরোনাম :
অনলাইন প্রতারণা রোধে বিশেষ কমিটির সিদ্ধান্ত শিগগিরই মন্ত্রিসভায় : ফাহমি ফাদজিল মেডিকেল ডিভাইস অনুমোদনে আসিয়ানের ঐতিহাসিক উদ্যোগ, সমন্বয় করবে মালয়েশিয়া ফ্যাসিস্টের হাত থেকে মুক্তি পেয়েছি, কিন্তু মূল্য দিয়েছি অনেক বেশি: রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর পদের আগে ‘মহামান্য’ ও ‘মাননীয়’ নয় ‘অপারেশন মেলানোপ্লাস’-এর আওতায় মাদকের বড় চক্রকে আটক করেছে পুলিশ ইন্দোনেশিয়ার মাদক চোরাচালান মামলায় দ্বিতীয় পাইলটকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ নেপালে উদ্ধার ও সহায়তা কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক তথ্য দিবে উইস্মা পুত্রা: নাদমা সরকারি খরচের কার্যকর বাস্তবায়ন ও সুফল নিশ্চিতের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর মন্ত্রিসভার ঐক্যই সরকারের স্থিতিশীলতার ভিত্তি: আনোয়ার ভর্তুকির চাপে সরকারি ব্যয়ে লাগাম টানার আহ্বান আনোয়ারের

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে ‘আমিন-স্বপন সিন্ডিকেট’ ভেঙে নতুন যুগের সূচনা : পর্দার আড়ালে কী ঘটেছিল?

ওয়াহিদ সোহান: বিশেষ প্রতিনিধি
  • সর্বশেষ আপডেট: শনিবার, ২ আগস্ট, ২০২৫

কুয়ালালামপুর: বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে নতুন দরজা খুলেছে, তবে এই পথ রক্তমাখা ছিল প্রশাসনিক ছলচাতুরি, আন্তর্জাতিক চাপে গোপন বৈঠক, এবং এক ভয়ঙ্কর রিক্রুটিং সিন্ডিকেটের দুর্বৃত্তায়নে ভরা। বহু বছর ধরে আমিন-স্বপনের নেতৃত্বে পরিচালিত একটি অপ্রতিরোধ্য মানবসম্পদ সিন্ডিকেটের দাপটে হাজারো শ্রমিক নিঃস্ব হয়েছেন। এখন, এক অভাবনীয় কূটনৈতিক কৌশল এবং গোয়েন্দা নজরদারির ফলে অবশেষে সেই সিন্ডিকেট ভেঙে নতুন, স্বচ্ছ, এবং সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন নিয়োগব্যবস্থা চালু হলো।

সিন্ডিকেটের খপ্পরে কতটা ভয়ঙ্কর ছিল চিত্রটি?

আমিন ও স্বপনের নেতৃত্বাধীন চক্র দীর্ঘদিন ধরে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর নামে ৫-৬ লাখ টাকা করে আদায় করত, যা প্রকৃত খরচের কয়েক গুণ বেশি। এই সিন্ডিকেটের শিকারে পরিণত হয়ে অনেক শ্রমিক বাড়ি-জমি বিক্রি করে পথে বসেছে। অথচ এসব কর্মীকে পাঠানো যেতো সরকারের নির্ধারিত সীমিত খরচে।
তাদের পেছনে ছিল মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের কিছু অসাধু কর্মকর্তা, যারা কমিশনের ভাগ নিয়ে এই সিন্ডিকেটকে নিরাপত্তা দিত।

বাংলাদেশ হাইকমিশনের ভেতরে ‘ভদ্রবেশী দালাল’দের নেটওয়ার্ক-

বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, মালয়েশিয়াস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনের কিছু উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সরাসরি এই সিন্ডিকেটের সাথে যুক্ত ছিলেন। নাম উঠে এসেছে, সাবেক মালেশিয়াস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনার শহিদুল ইসলাম,সীমাহীন দুর্নীতির অভিযোগে চাকুরী থেকে বহিস্কৃত সাবেক লেবার মিনিস্টার নাজমুশাহাদাৎ, বর্তমান হাইকমিশনার শামীম আহসান, দূতালয় প্রধান প্রণবকুমার, সাবেক ডেপুটি হাইকমিশনার খুরশেদ আলম খাস্তগীর,হাইকমিশনের লেবার কাউন্সিলর শরিফুল ইসলাম, প্রথম সচিব (লেবার) সুমন চন্দ্র দাস সহ, আরও কয়েকজনের। যারা আমিন-স্বপনের ‘লাইসেন্সধারী এজেন্সি’কে বিশেষ সুবিধা দিতে সক্রিয় ছিলেন।

বিস্ময়করভাবে, প্রবাসীকল্যাণ উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র ও মানবসম্পদ মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক হয় তা কোনো গণমাধ্যমকে না জানিয়ে সম্পুন্ন রূপে গোপন রাখা হয় । অথচ ওই বৈঠকেই সিন্ডিকেটকে পুনর্বহাল করার গোপন পরিকল্পনা হয় বলে দাবি করছে গোয়েন্দা সূত্র।

গোয়েন্দা সংস্থার হস্তক্ষেপ: নাটকের মোড় ঘুরে যায়-

বাংলাদেশের  গোয়েন্দা সংস্থার  কড়া নজরদারির মাধ্যমে উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ও সিন্ডিকেট প্রধান আমিনের গোপন কথোপকথনের তথ্য প্রধান উপদেষ্টা ড. মোহাম্মদ ইউনুসের হাতে পৌঁছায়। বিষয়টি জানার পরপরই প্রধান উপদেষ্টা ইউনুস মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমকে কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় সরাসরি অবহিত করেন।

আনোয়ার ইব্রাহিম, যিনি বরাবরই মানবিক নীতির পক্ষে, রীতিমতো চমকে ওঠেন এই সিন্ডিকেটের গভীরতা দেখে। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে সিন্ডিকেট বাতিল করে নতুন সরকারি চ্যানেলের মাধ্যমে নিয়োগের নির্দেশ দেন। বলা হয়ে থাকে, মালয়েশিয়া সরকারও বহুদিন ধরে এই সিন্ডিকেটের অবৈধ টাকা পাচার ও মানবপাচারের নেটওয়ার্ক নিয়ে সন্দিহান ছিল।

BOESL-এর মাধ্যমে নিয়োগ: কিভাবে হবে স্বচ্ছতা?

বর্তমানে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী পাঠানো হবে শুধু BOESL (বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড) এর মাধ্যমে। নিয়োগ চলবে মালয়েশিয়া সরকারের FWCMS (Foreign Workers Centralized Management System) এর আওতায়। অর্থাৎ, প্রতিটি পদক্ষেপ এখন ডিজিটাল, যাচাইযোগ্য ও সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীন।

১লা অগাস্ট মালয়েশিয়া বাংলাদেশ হাইকমিশনের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে এই প্রক্রিয়ায় কোনো দালাল বা সিন্ডিকেটের স্থান নেই। কর্মীদের যাবতীয় তথ্য, কোটা, কোম্পানির প্রোফাইলসহ ১৫টি  নথিপত্র জমা না দিলে নিয়োগ হবে না।

ভবিষ্যৎ আশঙ্কা: সিন্ডিকেট কি সত্যিই শেষ?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার যতই উদ্যোগ নিক, আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতির গাঁথুনি যদি ভাঙা না হয়, তবে সিন্ডিকেট হয়তো নতুন মুখে ফিরে আসতে পারে। তাই প্রয়োজন গণপর্যায়ে সচেতনতা, কূটনৈতিক স্বচ্ছতা, এবং গোয়েন্দা নজরদারি আরও জোরদার করা।

মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার উন্মুক্ত হওয়া নিঃসন্দেহে বড় সুখবর, কিন্তু তার চেয়েও বড় খবর হলো বাংলাদেশের রাষ্ট্রযন্ত্র প্রথমবারের মতো পেসিবাদ হাসিনা সরকারের মন্ত্রী-আমলাদেরদ্বারা গঠিত সিন্ডিকেট ভাঙতে সক্ষম হলো। এই লড়াই শুধু বিদেশগামী শ্রমিকদের নয় এটা ছিল সিস্টেমের ভেতরের দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের এক জেতা যুদ্ধ।

আরো পড়ুন

© All rights reserved © pbntv24
Developer Vom Tech
Translate »