দেইর আজ-জোর, সিরিয়া : একসময় সিরিয়ার তেল সমৃদ্ধ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত আল-তাইম তেলক্ষেত্র আজ রূপ নিয়েছে এক ধীরগতির পরিবেশগত বিপর্যয়ের কেন্দ্রে। দীর্ঘদিনের অবহেলা, যুদ্ধ এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো মিলিয়ে মরুভূমির এই প্রদেশ এখন বিষাক্ত বর্জ্যের নদীতে পরিণত হয়েছে।
যুদ্ধের আগেই যে অবকাঠামো দ্বারা তেল উত্তোলনের ক্ষতিকর উপজাতিকে নিরাপদে ভূগর্ভে পাঠানো হতো, তা ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় এখন ক্যানসার সৃষ্টিকারী ‘প্রডিউসড ওয়াটার’ ও অপরিশোধিত তেল অবিরামভাবে মাটির উপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। ছোট আকারের লিকেজ আজ রূপ নিয়েছে ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ বিষাক্ত নদীতে, যা মহাকাশ থেকেও দৃশ্যমান।
“এটি পাখিদের সঙ্গে সঙ্গে মেরে ফেলে,” জানালেন সাইটের নিরাপত্তা প্রকৌশলী মোহাম্মদ আল-তৌমা। তিনি হতাশা প্রকাশ করে বলেন, “কেউই পাত্তা দিচ্ছে না। দয়া করে বিশ্বকে বলুন, এটি বিষাক্ত ও প্রাণঘাতী বর্জ্য।”
দেইর আজ-জোর বহু বছর ধরেই দামেস্ক সরকারের অবহেলার শিকার। যুদ্ধকালীন সময়ে এই অঞ্চল দখল করে রেখেছিল আইএসআইএল (আইএসআইএস), পরে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট ও রাশিয়ার বিমান হামলা এবং সরকারপন্থী বাহিনী, ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়া ও স্থানীয় গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষে পুরো তেল অবকাঠামো কার্যত ধ্বংস হয়ে যায়।
আজও সেই ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন রয়েছে গুলির ছিদ্র করা পাইপলাইন, বিস্ফোরণে বিধ্বস্ত জ্বালানি ট্যাংক, আর বোমার আঘাতে বিকৃত ইস্পাত কাঠামো। আইএসআইএল একসময় এই তেলক্ষেত্র থেকে অর্থ উপার্জন করত, আর পরবর্তী হামলাগুলো সেই আয়ের উৎস বন্ধ করার জন্য চালানো হয়েছিল। ফলাফল: স্থানীয় জনগণের জন্য এক মারাত্মক বিষাক্ত উত্তরাধিকার।
সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ইউফ্রেটিস নদী, যা সিরিয়া ও ইরাকের কোটি মানুষের জীবনরেখা। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, একটি প্রবল ঝড় বা আকস্মিক বন্যা হলে এই বিষাক্ত বর্জ্য নদীতে মিশে যেতে পারে, ফলে কৃষিজমি, কূপ এবং পানীয়জল মারাত্মকভাবে দূষিত হবে।
বারবার আহ্বান সত্ত্বেও অতীত ও বর্তমান কোনও সিরিয়ান সরকারই পদক্ষেপ নেয়নি। স্থানীয় কর্মকর্তারা বলেছেন, নতুন নিষ্কাশন কূপ খননের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে কিছুই হয়নি।
যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন ও নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জে জর্জরিত নতুন সরকার পরিবেশগত পুনরুদ্ধারকে অগ্রাধিকারে রাখেনি। দেইর আজ-জোরে যেখানে হাসপাতালগুলো ন্যূনতম সুবিধা নিয়ে চলছে আর বিদ্যুৎ পাওয়া যায় দিনে কয়েক ঘণ্টা, সেখানে পরিবেশ সুরক্ষা তালিকার অনেক নিচে।
এখনো নীরবে বাড়ছে সেই বিষাক্ত তেলের স্রোত। যে তেল একসময় এই অঞ্চলের সমৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের উৎস ছিল, সেটিই আজ ধ্বংসের হুমকি তৈরি করছে।
বিশ্বের দৃষ্টি এড়িয়ে, এই বিষাক্ত নদী সিরিয়ার যুদ্ধের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী এবং অবহেলিত উত্তরাধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে।