২১ জুন, নিউ ইয়র্ক – ইরানের বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ইসরায়েল আঘাত হানলে তেজস্ক্রিয়তার ব্যাপক ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা উপসাগরীয় অঞ্চলের একাধিক দেশকে প্রভাবিত করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা (IAEA)-এর মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি।
ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে টানা অষ্টম দিনের মতো চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে শুক্রবার জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের এক জরুরি বৈঠকে গ্রোসি বলেন, রাশিয়া নির্মিত বুশেহর প্ল্যান্টে সরাসরি হামলা হলে “অত্যন্ত উচ্চমাত্রার তেজস্ক্রিয় পদার্থ নির্গত” হতে পারে, যার পরিণতি ইরানের সীমা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক হয়ে উঠবে।
“এটি কেবল একটি দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না,” গ্রোসি বলেন। “এই ধরনের আক্রমণে কয়েকশ কিলোমিটার দূরের জনগণকে সরে যেতে হবে, আইডোডিন ট্যাবলেট গ্রহণ করতে হতে পারে, খাদ্য সরবরাহ সীমিত করতে হবে এবং ব্যাপক পরিসরে তেজস্ক্রিয়তা পর্যবেক্ষণ চালাতে হবে।”
তিনি আবারও “সর্বোচ্চ সংযম” প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, “পারমাণবিক স্থাপনায় সশস্ত্র হামলা কখনোই ঘটানো উচিত নয়।” সেই সঙ্গে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ কিনা, তা নিরীক্ষা করতে IAEA-এর সক্ষমতা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
পারমাণবিক দুর্ঘটনার ভয় ক্রমেই বাড়ছে
ইসরায়েলের ১৩ জুন ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনায় বিমান হামলার পর পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে উঠেছে। ইরানি গণমাধ্যমে বুশেহরে বিমান প্রতিরক্ষা সক্রিয় হওয়ার খবর এলেও, এখন পর্যন্ত প্ল্যান্টে সফল হামলার নিশ্চিত প্রমাণ মেলেনি।
গ্রোসি বলেন, প্ল্যান্টে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বিপদ হতে পারে, যা কোর গলনের (reactor core meltdown) দিকে নিয়ে যেতে পারে। রাশিয়ার কর্মকর্তারাও বলেছেন, এতে চেরনোবিল-ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করে বলেন, ইরান-ইসরায়েল সংঘাত “একটি আগুন জ্বালাতে পারে, যা কেউই নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না।” তিনি শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানান।
ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির সাঈদ ইরাভানি বলেন, ইসরায়েলের হামলা আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন। তিনি ইরানি শিশুদের ছবি দেখিয়ে বলেন, এই সংঘাতে অসংখ্য বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারাচ্ছেন।
“যদি বিশ্ব পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ চুক্তিকে রক্ষা না করতে পারে, তবে নিরাপত্তা পরিষদকেও এর দায়ভার নিতে হবে,” বলেন ইরাভানি।
ইসরায়েলের প্রতিনিধি ড্যানি ড্যানন বলেন, “আমরা আত্মরক্ষার জন্য দুঃখ প্রকাশ করব না।” তিনি দাবি করেন, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ইউরোপ এবং এমনকি আমেরিকার পূর্ব উপকূলেও পৌঁছাতে পারে।
রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ভাসিলি নেবেনজিয়া বলেন, “ইসরায়েল শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালিয়ে বিশ্বকে একটি নজিরবিহীন বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।”
তেজস্ক্রিয়তা এখনো ছড়ায়নি, কিন্তু ঝুঁকি রয়েই গেছে
গ্রোসি জানান, নতাঞ্জ, ইসফাহান, ফোর্ডো এবং খোন্দাব— এসব স্থাপনায় ইসরায়েলি হামলা হয়েছে, তবে এখন পর্যন্ত তেজস্ক্রিয়তার কোনো ছড়িয়ে পড়া শনাক্ত হয়নি। তবে তিনি আরও বলেন, সক্রিয় পারমাণবিক চুল্লিতে হামলা হলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।
আলোচনার ইচ্ছা, তবে সীমার মধ্যে
এদিকে, ইরানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা Reuters-কে জানান, তেহরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা করতে প্রস্তুত, তবে সম্পূর্ণ বন্ধের প্রস্তাব “বর্তমানে গ্রহণযোগ্য নয়, বিশেষত ইসরায়েলের হামলার প্রেক্ষাপটে।”
যুদ্ধের দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রবেশের সাথে সাথে, ইতিমধ্যে ইরানে ৬০০ এবং ইসরায়েলে ২৪ জন নিহত হওয়ার পর, আন্তর্জাতিক মহলে আতঙ্ক ছড়িয়েছে যে পারমাণবিক কোনো ঘটনা এই সংঘাতকে আঞ্চলিক ধ্বংসযুদ্ধে রূপ দিতে পারে।
“এখনই সংলাপের সময়—বিনাশ নয়,” বলেন রাফায়েল গ্রোসি।