নয়াদিল্লি: ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের হিমালয় অঞ্চলের ধারালি শহরে ভয়াবহ বন্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের পেছনে রয়েছে একটি গলিত হিমবাহ হ্রদের ধস বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্র প্রভাবই এই বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ বলে সতর্ক করছেন পরিবেশবিদরা।
গত মঙ্গলবার (৫ আগস্ট) ধারালিতে একটি সরু পর্বত উপত্যকায় বন্যার স্রোত হঠাৎ নেমে আসে, পানির সঙ্গে কাদা ও ধ্বংসাবশেষ পুরো শহরটিকে ধ্বংস করে দেয়। প্রচণ্ড স্রোতে কয়েকটি ভবন মুহূর্তেই ভেঙে পড়ে, আর অনেক বাসিন্দা প্রাণ বাঁচাতে দৌড়েও রক্ষা পাননি।
সরকারি হিসাবে এখন পর্যন্ত ৪ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে এবং ৫০ জনের বেশি নিখোঁজ রয়েছেন।
সরকার প্রথমে এই দুর্যোগের কারণ হিসেবে প্রবল ‘ক্লাউডবার্স্ট’ বা হঠাৎ প্রবল বৃষ্টিকে দায়ী করলেও, বিশেষজ্ঞরা বলছেন এটি ছিল শেষ মাত্রার একটি ‘ট্রিগার’, এর আগে কয়েকদিন ধরে চলা অব্যাহত ভারী বৃষ্টি ভূমিকে দুর্বল করে তোলে।
জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (নয়াদিল্লি) হিমালয় বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ড. পি. কে. জোশি বলেন, বন্যাটি সম্ভবত একটি গলিত হিমবাহ হ্রদের ধসে সৃষ্টি হয়েছে, যেখানে হিমবাহ গলনের ফলে তৈরি হওয়া হ্রদটি নরম পাথর ও মাটির বাঁধে (মোরেইন) আটকে ছিল।
“গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিপাত ও হঠাৎ প্রবল স্রোত এই দুটি বিষয় ইঙ্গিত দেয় যে এটি একটি গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড (GLOF) বা হিমবাহ হ্রদ ধস ছিল,” বলেন ড. জোশি।
তিনি আরও জানান, ধসে পড়া এলাকা উপত্যকার ঊর্ধ্ব দিকে অবস্থিত, যেখানে অস্থির সেডিমেন্ট বা খনিজাংশের অঞ্চল রয়েছে, যা ধসের ঝুঁকি অনেক বেশি।
বিশেষজ্ঞরা বহুদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন যে, হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহগুলো দ্রুত গলছে এবং এর ফলে নতুন হিমবাহ হ্রদ তৈরি হচ্ছে, যেগুলো দুর্বল প্রাকৃতিক বাঁধ দ্বারা আটকে থাকে।
এই ধরনের হ্রদগুলোর বাঁধ যে কোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে বিশেষ করে অতিবৃষ্টি, ভূমিকম্প বা উষ্ণ তাপমাত্রার প্রভাবে।
বর্তমানে ঘন মেঘের কারণে স্যাটেলাইট চিত্র পর্যবেক্ষণে বাধা থাকায় সঠিক উৎস এখনো নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করা যায়নি, তবে জোশি বলেন, প্রাথমিক উপাত্তগুলো হিমবাহধস-সম্পর্কিত ঘটনার দিকেই ইঙ্গিত করছে।
বন্যার পর জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলা বাহিনী (NDRF) ও ভারতীয় সেনাবাহিনী উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। দুর্গম পাহাড়ি পথ ও খারাপ আবহাওয়া কাজকে বাধাগ্রস্ত করছে।
সরকার স্থানীয়দের সতর্ক থাকতে বলেছে, কারণ সামনে আরও বৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই দুর্যোগ আবারও হিমবাহ হ্রদ পর্যবেক্ষণ ও আগাম সতর্কবার্তা জারি করার ব্যবস্থার গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।
“এই ধরনের ঘটনা এখন আর বিরল নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতা অনুযায়ী আমাদের দ্রুত অভিযোজন করতে হবে—বিশেষ করে হিমালয় অঞ্চলের মতো সংবেদনশীল এলাকায়,” — বলেন ড. জোশি।