কুয়ালালামপুর : মালয়েশিয়া বিশ্বের অন্যতম সবচেয়ে বিশ্বস্ত দেশের তালিকায় নিজের অবস্থান আরও শক্ত করেছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এডেলম্যান-এর প্রকাশিত “এডেলম্যান ট্রাস্ট ব্যারোমিটার ২০২৬” অনুযায়ী, মালয়েশিয়া বিশ্বের সপ্তম সর্বাধিক বিশ্বস্ত দেশ হিসেবে স্থান পেয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৫ সালে মালয়েশিয়ার সামগ্রিক “বিলিফ ইনডেক্স” ছিল ৬৬, যা ২০২৬ সালে বেড়ে ৭১-এ পৌঁছেছে। এই সূচক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, সরকার, গণমাধ্যম এবং বেসরকারি সংস্থার প্রতি জনগণের আস্থার মাত্রা পরিমাপ করে।
সমীক্ষায় অংশ নেওয়া ২৮টি দেশের মধ্যে অর্ধেকেরও কম দেশে চারটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিই জনগণের আস্থা “ট্রাস্ট টেরিটরি”-তে ছিল। মালয়েশিয়া সেই কয়েকটি দেশের একটি।
তবে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, মালয়েশিয়ানদের মধ্যে আস্থার বড় অংশ সীমাবদ্ধ রয়েছে নিজেদের পরিচিত রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর মধ্যে। সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৬৫ শতাংশ মালয়েশিয়ান “ইনসুলার ট্রাস্ট মাইন্ডসেট”-এ বিশ্বাসী। অর্থাৎ, ভিন্ন মতাদর্শ, তথ্যের উৎস বা সাংস্কৃতিক পটভূমির মানুষের প্রতি তাদের আস্থা কম।
আরও উদ্বেগজনক তথ্য হলো, ৮৭ শতাংশ মালয়েশিয়ান মনে করেন, ভিন্ন মতের মানুষের মধ্যে অবিশ্বাস এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তারা একে অপরের জীবন কঠিন করে তুলতে চায়। সমীক্ষায় অংশ নেওয়া সব দেশের মধ্যে এটি ছিল সর্বোচ্চ হার।
অন্যদিকে, মাত্র ৩৭ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন যে তারা নিয়মিতভাবে ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের তথ্যসূত্র থেকে খবর সংগ্রহ করেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মালয়েশিয়ায় “ডোমেস্টিক ট্রাস্ট অ্যাডভান্টেজ” বিদ্যমান। স্থানীয় কোম্পানির প্রতি মানুষের আস্থা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের তুলনায় ১৮ পয়েন্ট বেশি। গবেষকরা একে “পরিচিতের দিকে ফিরে যাওয়ার প্রবণতা” হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
মাজুইন জিন” বলেন, মালয়েশিয়ার উচ্চ আস্থার স্কোর অবশ্যই বড় অর্জন, কারণ এটি অর্থনৈতিক আত্মবিশ্বাস, প্রতিষ্ঠানের গ্রহণযোগ্যতা এবং আন্তর্জাতিক মর্যাদার সঙ্গে জড়িত।
তিনি বলেন, “মালয়েশিয়ানরা সবচেয়ে বেশি আস্থা রাখেন তাদের মতো চিন্তাধারা ও তথ্যসূত্র ব্যবহারকারী মানুষের ওপর। কিন্তু এই বিভাজন বাড়তে থাকলে দেশের ট্রাস্ট অ্যাডভান্টেজ দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।”
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, বিশ্বজুড়ে ৬৭ শতাংশ কর্মী আসন্ন মন্দার কারণে চাকরি হারানোর আশঙ্কায় ভুগছেন। এছাড়া ৬৬ শতাংশ মানুষ মনে করেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিরোধ তাদের চাকরির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
মালয়েশিয়ানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদও কমেছে। মাত্র ৩৯ শতাংশ মানুষ মনে করেন আগামী প্রজন্ম বর্তমান প্রজন্মের তুলনায় ভালো অবস্থায় থাকবে, যা আগের বছরের তুলনায় ৭ শতাংশ কম।
এছাড়া আয়ের ভিত্তিতে আস্থার ব্যবধানও বাড়ছে। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে উচ্চ ও নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে আস্থার পার্থক্য ১৬ পয়েন্টে পৌঁছেছে। মালয়েশিয়ায় এই ব্যবধান ৯ পয়েন্ট।
গবেষণায় বলা হয়েছে, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলো এই বৈষম্য কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নিম্ন আয়ের মানুষ এমন প্রতিষ্ঠানের ওপর ১৮ পয়েন্ট বেশি আস্থা রাখেন, যারা সমাজে অন্তর্ভুক্তি ও আত্মবিশ্বাস বাড়াতে কাজ করে।
ভুয়া তথ্য নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। ৭৩ শতাংশ মালয়েশিয়ান মনে করেন, বিদেশি পক্ষগুলো গণমাধ্যম ব্যবহার করে দেশে বিভাজন তৈরির জন্য মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে। এই উদ্বেগের দিক থেকে মালয়েশিয়া বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবস্থানে রয়েছে, শুধুমাত্র ইউনাইটেড আরব আমিরাত এর পরে।
সমীক্ষায় আরও উঠে এসেছে, মানুষ এখন প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে সমাজে ঐক্য গড়ে তোলার আরও বড় ভূমিকা প্রত্যাশা করছে।
এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের ৭৭ শতাংশ কর্মী মনে করেন, নিয়োগদাতাদের উচিত বিভক্ত গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে আস্থা গড়ে তোলা। তবে মাত্র ৫৪ শতাংশ মানুষ বিশ্বাস করেন যে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো এ কাজে সফল হচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী ৮২ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, কর্মক্ষেত্রে অভিন্ন পরিচয় ও সংস্কৃতি গড়ে তোলা সমাজে ঐক্য প্রতিষ্ঠার অন্যতম কার্যকর উপায়। এছাড়া ৮১ শতাংশ মনে করেন, ভিন্ন মতাদর্শের মানুষকে একসঙ্গে কাজের সুযোগ দিলে পারস্পরিক আস্থা বাড়ে।
মালয়েশিয়ায় ৩৮ শতাংশ মানুষ মনে করেন, সামাজিকভাবে স্পর্শকাতর বিষয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত পক্ষ নেওয়ার পরিবর্তে মানুষকে একসঙ্গে কাজ করতে উৎসাহিত করা। অন্যদিকে ৩২ শতাংশ চান প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের মূল্যবোধের ভিত্তিতে অবস্থান নিক, আর ১১ শতাংশ মনে করেন ব্যবসাগুলোর এ ধরনের বিষয় এড়িয়ে চলা উচিত।