টানা ২৮ দিন আইসিইউতে জীবনযুদ্ধ, আর ফিরল না ৬ মাসের শিশু আমিরা

পিবিএন টিভি ২৪ রিপোর্ট:
  • সর্বশেষ আপডেট: শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬

মাত্র ছয় মাস বয়স। যে বয়সে মায়ের কোলে হাসি–খুশিতে বড় হওয়ার কথা, সেই বয়সেই হাসপাতালের বিছানায় ক্যানোলা, অক্সিজেন মাস্ক আর অসহনীয় চিকিৎসা যন্ত্রণা ছিল তার নিত্যসঙ্গী। তিন মাস ধরে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটেছেন বাবা। নিজের সাধ্যমতো সবটুকু উজাড় করে দিয়েছেন। সরকারি হাসপাতাল, বেসরকারি হাসপাতাল, যেখানে আশার আলো মিলেছে, সেখানেই ছুটেছেন। তবুও শেষরক্ষা হলো না। পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে গেল শিশু আমিরা।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের চাকপাড়া গ্রামের বাসিন্দা, ৪০তম বিসিএসে সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ শিবগঞ্জের আদিনা ফজলুল হক সরকারি কলেজে প্রভাষক হিসেবে কর্মরত ইউসুফ আলী মন্ডল। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী। তার একমাত্র কন্যা আমিরা বৃহস্পতিবার (১৪ মে) বিকাল ৪টার দিকে রাজধানীর ধানমন্ডির ইবনে সিনা স্পেশালাইজড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। শুক্রবার (১৫ মে) সকাল ৯টায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের চরবাগডাঙ্গা কেন্দ্রীয় কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয় শিশুটিকে। ছোট্ট শিশু আমিরার মৃত্যুতে পরিবারজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ৪ নভেম্বর জন্ম নেয় আমিরা। জন্মের পর প্রথম তিন মাস সুস্থ থাকলেও পরে হঠাৎ শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। শুরুতে চিকিৎসকেরা নিউমোনিয়া সন্দেহ করে সে অনুযায়ী চিকিৎসা দিলেও অবস্থার তেমন উন্নতি হয়নি। পরে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন হাসপাতাল ও চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন বাবা-মা। অবস্থার অবনতি হলে নেয়া হয় রাজশাহীতে। সেখানে সরকারি ও স্বনামধন্য বেসরকারি হাসপাতাল এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে দীর্ঘদিন চিকিৎসা চলে। দুই দফা এনআইসিইউতে ভর্তি রাখতে হয় শিশুটিকে।

কিন্তু অবস্থার উন্নতি হয়নি। শ্বাসকষ্ট আরও বাড়তে থাকলে উন্নত চিকিৎসার আশায় রাজশাহী থেকে আইসিইউ অ্যাম্বুলেন্সে করে আমিরাকে নেয়া হয় ঢাকায়। উদ্দেশ্য ছিল রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ভর্তি করানো। তবে সেখানে পিআইসিইউ শয্যা খালি না থাকায় ভর্তি নেয়া হয়নি। পরে শিশুটিকে অ্যাম্বুলেন্সে করে রাজধানীর বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে নেয়া হলেও কোথাও শয্যা না পাওয়ায় ভর্তি করানো সম্ভব হয়নি। একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে রাজধানীর ধানমন্ডির ইবনে সিনা স্পেশালাইজড হাসপাতালের পিআইসিইউতে ভর্তি করা হয়। টানা ২৮ দিন সেখানে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে ছোট্ট শিশুটি। এর মধ্যে দুইবার লাইফ সাপোর্টে নেয়া হয় তাকে।

প্রায় তিন মাস চিকিৎসা চললেও চিকিৎসকেরা শিশুটির রোগের নির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিতভাবে নির্ণয় করতে পারেননি বলে জানিয়েছে পরিবার। উন্নত জেনেটিক পরীক্ষার অংশ হিসেবে ‘হোল এক্সোম সিকোয়েন্সিং’ পরীক্ষার নমুনা ভারতে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু সেই রিপোর্ট আসার আগেই থেমে যায় আমিরার জীবনযুদ্ধ।

মেয়ের মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক হৃদয়বিদারক স্ট্যাটাসে বাবা ইউসুফ আলী মন্ডল লেখেন, ‘আমিরা, তোর ব্যর্থ বাবাকে ক্ষমা করে দিস মা। তিন মাস ধরে অনেক যন্ত্রণা পেয়েছিস, তবুও তোর জন্য কিছুই করতে পারলাম না মা।’ এরও আগে, মেয়ের মৃত্যুর খবর জানাতে গিয়ে তিনি লিখেছিলেন, ‘আমার কলিজার টুকরা আমিরা এই দুনিয়ার সফর শেষ করে আল্লাহর জিম্মায় চলে গেছে।’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমজুড়ে ছড়িয়ে আছে এক অসহায় বাবার লড়াইয়ের গল্প। কখনও তিনি মেয়েকে বিদেশে নেয়ার জন্য এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে নেয়ার খরচ জানতে চেয়েছেন, কখনও জরুরি মেডিকেল ভিসা পাওয়ার উপায় খুঁজেছেন। মৃত্যুর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেও লিখেছিলেন, ‘আমিরার অবস্থা খুবই ক্রিটিক্যাল। আমার মেয়েটাকে বাঁচাতে চাই…”

মৃত্যুর একদিন আগে করা আরেক পোস্টে শিশুটির দীর্ঘ চিকিৎসাযন্ত্রণার কথা লিখতে গিয়ে তিনি প্রশ্ন রেখেছিলেন, ‘ছয় মাসের একটা শিশুর সহ্য করার ক্ষমতা কত?’ তিনি জানান, শিশুটির শরীরে এমন জায়গা প্রায় ছিল না, যেখানে ক্যানোলা করা হয়নি। প্রায় প্রতিদিন রক্ত পরীক্ষা, ক্যানোলা, অক্সিজেন সাপোর্ট আর অসংখ্য চিকিৎসাপদ্ধতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে ছোট্ট আমিরাকে।

বাংলাদেশের চিকিৎসাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা নিয়েও হতাশা প্রকাশ করেছিলেন এই শিক্ষক। ফেইসবুকে দেয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছিলেন, ‘চিকিৎসা আমাদের মৌলিক অধিকার। অথচ এই চিকিৎসার জন্য দৌড়াদৌড়ি করতে করতে সাধারণ নাগরিকদের যায় যায় অবস্থা। বাংলাদেশে সঠিক চিকিৎসা পাওয়া যেন সোনার হরিণ।’

তিনি আরও উল্লেখ করেন, রাজধানীর সরকারি শিশু হাসপাতালে পিআইসিইউ শয্যা না পেয়ে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছোটার অভিজ্ঞতার কথা। একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে ব্যয়বহুল বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়। প্রতিদিন চিকিৎসা, লাইফ সাপোর্ট, ভেন্টিলেশন, ওষুধ ও পরীক্ষার পেছনে ১৪ লাখ টাকার বেশি ব্যয় হলেও মেয়েকে বাঁচানো যায়নি।

পরিবারের ঘনিষ্ঠজনেরা জানান, সামর্থ্যের বাইরে গিয়েও চিকিৎসা চালিয়ে গেছেন ইউসুফ আলী মন্ডল। সহকর্মী, আত্মীয়স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা সহায়তার হাত বাড়ালেও চিকিৎসার ব্যয় সামাল দিতে গিয়ে ঋণের বোঝাও বাড়ে। কিন্তু কোনো কিছুই তাকে থামাতে পারেনি। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা করে গেছেন কন্যাকে বাঁচানোর।

স্বজনদের ভাষ্য, তিন মাস ধরে হাসপাতালের করিডোরেই যেন কেটে গেছে এই দম্পতির দিন-রাত। কখনো রাজশাহী, কখনো ঢাকা, শুধু একটি আশায়, যদি বেঁচে যায় তাদের ছোট্ট মেয়েটি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব চেষ্টা, সব প্রার্থনা, সব ব্যাকুলতা হার মেনেছে নির্মম বাস্তবতার কাছে।

আজ চরবাগডাঙ্গার মাটিতে ছোট্ট আমিরা ঘুমিয়ে আছে চিরনিদ্রায়। আর বাবা ইউসুফ আলী মন্ডলের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দেয়ালে রয়ে গেছে এক অসহায় পিতার আর্তনাদ, একটি শিশুকে বাঁচিয়ে রাখার শেষ চেষ্টা করেও না পারার গভীর বেদনার সাক্ষ্য।

আরো পড়ুন
© All rights reserved © pbntv24
Developer Vom Tech
Translate »