উত্তর কোরিয়া তাদের নতুন আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র (আইসিবিএম) ‘হোয়াসং-২০’ উন্মোচন করেছে, যাকে দেশটি ‘সবচেয়ে শক্তিশালী পারমাণবিক কৌশলগত অস্ত্র’ বলে দাবি করেছে। শনিবার (১১ অক্টোবর) পিয়ংইয়ংয়ের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, রাজধানীতে অনুষ্ঠিত এক বিশাল সামরিক কুচকাওয়াজে প্রথমবারের মতো এই ক্ষেপণাস্ত্র প্রদর্শন করা হয়।
অনুষ্ঠানে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উন বলেন, “একমাত্র সামরিক শক্তির মাধ্যমেই জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা সম্ভব।” তিনি সেনাবাহিনীকে “অপরাজেয় ও শ্রেষ্ঠ বাহিনীতে” পরিণত হওয়ার আহ্বান জানান।
কিমের বক্তব্য ও সামরিক বার্তা
কিম বলেন, “আমাদের বাহিনীকে এমনভাবে শক্তিশালী হতে হবে, যাতে রাজনৈতিক, আদর্শিক, সামরিক ও প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে শত্রুকে পরাজিত করা যায়।”
তিনি আরও যোগ করেন, উত্তর কোরিয়া “নৈতিকতা ও শৃঙ্খলার শক্তির ওপর নির্ভর করে ধারাবাহিক বিজয় অর্জনকারী একটি অভিজাত সেনাবাহিনীতে” পরিণত হবে।
তরল-জ্বালানির ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায়, এই নতুন কঠিন-জ্বালানির ক্ষেপণাস্ত্র অধিক গতিশীল, সহজে সনাক্ত করা যায় না এবং অল্প সময়ে উৎক্ষেপণ সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, হোয়াসং-২০ যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো অঞ্চলে আঘাত হানতে সক্ষম।
কিম জং-উন বলেন, উত্তর কোরিয়া “অন্যায় ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে” লড়াই চালিয়ে যাবে—যা মূলত যুক্তরাষ্ট্রের দিকেই ইঙ্গিত। তবে তিনি সরাসরি ওয়াশিংটন বা সিউলের বিরুদ্ধে হুমকি দেননি।
ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা ও রাশিয়ার সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত
কোরিয়া ডিফেন্স নেটওয়ার্কের পরিচালক লি ইল-উ বলেন, “এটি সম্পূর্ণ নতুন আইসিবিএম, যা একসঙ্গে আমেরিকার পূর্ব উপকূলে একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে সক্ষম।”
তিনি মনে করেন, হোয়াসং-২০ সম্ভবত রাশিয়ার টোপোল-এম ক্ষেপণাস্ত্রের আদলে তৈরি এবং এর উন্নয়নে রাশিয়ার সহযোগিতা থাকতে পারে।
ক্ষেপণাস্ত্রটির গোল ও ভোঁতা নাক ইঙ্গিত দেয়, এটি একাধিক ওয়ারহেড (MIRV) বহন করতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করবে।
তবে, কোরিয়া ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল ইউনিফিকেশনের বিশেষজ্ঞ চো হান-বুম সতর্ক করে বলেন, “হোয়াসং-২০ নিয়ে অতিরিক্ত অনুমান করা ঠিক নয়,” কারণ এখনো এর পূর্ণাঙ্গ ফ্লাইট টেস্ট হয়নি।
রাশিয়া-চীন-উত্তর কোরিয়া ত্রিমুখী ঘনিষ্ঠতা
কুচকাওয়াজে উপস্থিত ছিলেন চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং, ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান তো লাম এবং রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ।
কিমের বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি হুমকি না দিয়ে বরং রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে কৌশলগত মৈত্রী জোরদারের বার্তা ছিল স্পষ্ট।
গবেষক দো জিন-হো বলেন, “উত্তর কোরিয়া রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রে গড়ে ওঠা মিত্রতা প্রদর্শন করছে। কিম যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়ে দিচ্ছেন যে, উত্তর কোরিয়া এখন একটি পরমাণু-সক্ষম রাষ্ট্র, যার মর্যাদা অপরিবর্তনীয়।”
নতুন স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ‘হোয়াসং-১১এমএ’
একই কুচকাওয়াজে উত্তর কোরিয়া হোয়াসং-১১এমএ নামের একটি স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রদর্শন করে, যা হাইপারসনিক ওয়ারহেড বহন করতে সক্ষম। এই ক্ষেপণাস্ত্র দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের কিছু অংশকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে।
কৌশলগত অংশীদারিত্বে রাশিয়া
এর আগের দিন, কিম পিয়ংইয়ংয়ে দিমিত্রি মেদভেদেভের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে দুই দেশের মধ্যে “কৌশলগত অংশীদারিত্ব” আরও জোরদার করার বিষয়ে আলোচনা হয়।
উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, কিম আশা প্রকাশ করেছেন যে এই সফর উত্তর কোরিয়া-রাশিয়া সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে এবং দুই দেশের মৈত্রী আরও “প্রাণবন্ত ও কৌশলগত” হবে।
ছবি: পিয়ংইয়ংয়ে অনুষ্ঠিত কুচকাওয়াজে প্রদর্শিত হোয়াসং-২০ ক্ষেপণাস্ত্র।
সূত্র: কেসিএনএ, রয়টার্স, দ্য গার্ডিয়ান