কুয়ালালামপুর, ৯ জুলাই ২০২৫ (PBN NEWS) — মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী দাতুক সেরি আনোয়ার ইব্রাহিম আজ কুয়ালালামপুরে ৫৮তম আসিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক (AMM)-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। তিনি তার মূল বক্তব্যে আঞ্চলিক ঐক্য, কৌশলগত সমন্বয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক দৃঢ়তা জোরদারের ওপর জোর দেন, বিশেষ করে বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে।
আসিয়ান সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রী, তিমোর-লেস্তে, আসিয়ান মহাসচিব ড. কাও কিম হোর্ন এবং অন্যান্য গণ্যমান্য অতিথিদের উদ্দেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার বলেন, ২০২৫ সালের এই চেয়ারম্যানশিপ আসিয়ানের ভিশন ২০৪৫ বাস্তবায়নের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ।
“এই চেয়ারম্যানশিপ এমন এক সময়ে এসেছে যখন আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে: আসিয়ানের অগ্রাধিকার কী হবে, বিশ্বের দরবারে আমাদের কণ্ঠস্বর কেমন হবে, এবং ২০৪৫ সাল পর্যন্ত আমরা কীভাবে এই অঞ্চলকে পরিচালিত করবো,” — বলেন আনোয়ার।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আসিয়ান গঠিত হয়েছিল জটিলতা থেকে — এমন একটি সময়ে, যখন বিভাজনের বিপদ ও সংলাপের সম্ভাবনা অনুধাবন করেছিল এই অঞ্চলের দেশগুলো। শান্তি ও সমৃদ্ধি অর্জনে আসিয়ানের সাফল্য এসেছে মিথস্ক্রিয়া, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও ঐকমত্যের মাধ্যমে।
তিনি জানান, মালয়েশিয়া দীর্ঘদিন ধরেই তিমোর-লেস্তে-র আসিয়ান সদস্যপদ অর্জনের পক্ষে এবং আসন্ন অক্টোবর মাসে তার পূর্ণাঙ্গ সদস্যপদ গ্রহণে তিনি সকল সদস্য রাষ্ট্রকে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চলমান সংঘাত ও একতরফা ভূ-রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি গাজা, ইউক্রেন, মিয়ানমার ও মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার কথা উল্লেখ করেন এবং সতর্ক করেন যে এসব সঙ্কট আন্তর্জাতিক আইন, জ্বালানি নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
“যদি নিয়ম কেবল সুবিধামতো প্রয়োগ করা হয়, তাহলে বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা টিকে থাকতে পারে না,” — বলেন তিনি। “অন্যরা পিছু হটলেও আসিয়ানকে নিয়মের পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে হবে।”
তিনি বলেন, বাস্তবতা ও মূল্যবোধ একে অপরের বিপরীত নয়, বরং এই দুটোই আসিয়ানকে আগামী দিনের সিদ্ধান্ত গ্রহণে পথ দেখাবে।
প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ভূ-অর্থনীতির উত্থান এবং বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য নীতিকে রাজনৈতিক চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতার ওপর আলোকপাত করেন। তিনি একে “আমাদের সময়ের নতুন আবহাওয়া” হিসেবে অভিহিত করেন।
তিনি বলেন, কেবল ঘোষণাতেই নয়, আসিয়ানের ঐক্য ও সংহতি প্রতিফলিত হতে হবে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, কৌশলগত পরিকল্পনা ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে।
এক্ষেত্রে আসিয়ান ভিশন ২০৪৫-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং অর্থমন্ত্রীদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের ওপর জোর দেন এবং বলেন, আরও বেশি আঞ্চলিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ-এর মাধ্যমে আসিয়ানকে আরও দৃঢ় ও সংযুক্ত করতে হবে।
আসিয়ান কেন্দ্রীয়তা ও সার্বভৌম কণ্ঠস্বর
আঞ্চলিক কূটনীতিতে আসিয়ান কেন্দ্রীয়তা-কে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আনোয়ার বলেন, কোনও বহিরাগত শক্তিকে এই অঞ্চলকে বিভক্ত করার সুযোগ দেওয়া যাবে না।
“আমরা এমন একটি অঞ্চল, যারা নিজেদের পথ নিজেরা নির্ধারণ করে—সুচিন্তিত, সুনির্দিষ্ট ও উদ্দেশ্যমূলকভাবে। আসিয়ান কারও অনুপস্থিতিতে প্রতিনিধিত্ব করবে না,” — তিনি সতর্ক করেন।
বক্তৃতার শেষদিকে প্রধানমন্ত্রী মনে করিয়ে দেন, আসিয়ানের সাফল্য কাগুজে ঘোষণায় নয়, বরং বাস্তব ফলাফল ও জনগণের কল্যাণে প্রমাণিত হওয়া উচিত—খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জলবায়ু সহনশীলতা এবং ডিজিটাল রূপান্তরের মতো খাতে।
“ব্যাটামবাং থেকে চিয়াং রাই, সিটওয়ে থেকে দিলি পর্যন্ত—আমাদের জনগণই এই সম্প্রদায়ের মূল উদ্দেশ্য,” — তিনি বলেন। “এই বৈঠক আমাদের এই বিশ্বাসকে আরও মজবুত করুক: আসিয়ান এক ও অভিন্ন, সহনশীল ও সম্মানিত থাকবে।”
এর পর আনুষ্ঠানিকভাবে ৫৮তম আসিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের উদ্বোধন ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার, যা চলতি সপ্তাহ জুড়ে কৌশলগত সংলাপ, ত্রিপক্ষীয় বৈঠক এবং উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক আলাপ-আলোচনার সূচনা করে।