রাজধানীর অদূরে শিল্প–অধ্যুষিত জেলা গাজীপুর দেশের অর্থনীতি, রাজনীতি ও শিল্প খাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। তৈরি পোশাকশিল্প, ভারী ও মাঝারি শিল্পকারখানা, কৃষি উৎপাদন ও দ্রুত বর্ধনশীল নগরায়ণের কারণে জাতীয়ভাবে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে এই জেলা। স্বাধীনতার পর এবারই প্রথম গাজীপুর থেকে মন্ত্রিসভায় কারও স্থান হয়নি। এ নিয়ে হতাশ জেলাবাসী। অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন।
স্থানীয় ভোটারদের ভাষ্য, মন্ত্রিসভা গঠনে আঞ্চলিক ভারসাম্য, অভিজ্ঞতা ও দলীয় কৌশল বিবেচনায় নেওয়া হয়। ফলে কোনো গুরুত্বপূর্ণ জেলা থেকেও প্রতিনিধি না–ও থাকতে পারে। তবে গাজীপুরের মতো শিল্পসমৃদ্ধ ও জনবহুল জেলা থেকে কাউকে অন্তর্ভুক্ত না করায় আলোচনা তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক।
দলীয় ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ছিলেন গাজীপুরের কাপাসিয়ার বাসিন্দা তাজউদ্দীন আহমদ। স্বাধীনতার পর সব সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে গাজীপুরের কেউ না কেউ প্রতিনিধিত্ব করেছেন। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদেও জেলার অনেক বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ দায়িত্ব পালন করেছেন। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় বাণিজ্যমন্ত্রী ছিলেন চৌধুরী তানভীর আহমেদ সিদ্দিকী। খালেদা জিয়ার আমলে গাজীপুর থেকে আ স ম হান্নান শাহ ও এম এ মান্নান মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। এমনকি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় একজন মন্ত্রী ও একজন প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করেছেন। অতীতে বিভিন্ন সরকারের আমলে গাজীপুর থেকে অন্তত একজন মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করলেও এবার বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের পর গাজীপুর থেকে কাউকে মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী করা হয়নি। এতে জেলা ও উপজেলা বিএনপির নেতা–কর্মী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
মৌচাক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান (ভারপ্রাপ্ত) ও কালিয়াকৈর উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম বলেন, গাজীপুর–১ আসন থেকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে মেয়র মো. মজিবুর রহমান জয়লাভ করেছেন। এ ছাড়া আরও তিনটি আসনে বিএনপি জয়ী হয়েছে। তাঁরা আশা করেছিলেন, গাজীপুরের কেউ না কেউ মন্ত্রিসভায় থাকবেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে দাবি, তিনি যেন গাজীপুরবাসীর এ প্রত্যাশা পূরণ করেন।
জেলা নির্বাচন কার্যালয়ের তথ্যমতে, গাজীপুরের পাঁচটি আসনের মধ্যে চারটিতে জয়ী হয়েছেন বিএনপির প্রার্থীরা। এর মধ্যে গাজীপুর–১ (কালিয়াকৈর ও সিটির একাংশ) আসনে মজিবুর রহমান, গাজীপুর–২ (সদর ও টঙ্গী) আসনে এম মঞ্জুরুল করিম, গাজীপুর–৩ (শ্রীপুর ও সদর একাংশ) আসনে এস এম রফিকুল ইসলাম ও গাজীপুর–৫ (কালীগঞ্জ ও সদর একাংশ) এ কে এম ফজলুল হক মিলন জয়ী হয়েছেন।
গাজীপুর জজকোর্টের আইনজীবী রফিকুল ইসলাম বলেন, নির্বাচনে জেলার ব্যাপক সাফল্যের পর স্থানীয় নেতা–কর্মীরা আশা করেছিলেন, অন্তত একজনকে মন্ত্রিসভায় স্থান দেওয়া হবে। কিন্তু ঘোষিত মন্ত্রিসভায় গাজীপুরের কোনো প্রতিনিধির নাম না থাকায় নেতা–কর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
মহানগর বিএনপির সভাপতি শওকত হোসেন সরকার প্রথম আলোকে বলেন, ‘নবীন–প্রবীণের সমন্বয়ে অনেক ভালো একটি মন্ত্রিসভা হয়েছে। যাঁদের সততা, নিষ্ঠা সম্পর্কে দেশবাসী জানেন। আমরা আশাবাদী, তাঁদের নেতৃত্বে দেশ এগিয়ে যাবে। তবে মন্ত্রিসভায় গাজীপুরের কাউকে না রাখায় আমরা আশাহত হয়েছি।’
শুধু নেতা–কর্মীরাই নন, সাধারণ মানুষও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছেন। ভোগড়া এলাকার বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী খায়রুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের এলাকায় শিল্পকারখানা বেশি। পরিবেশদূষণ, যানজট, অবকাঠামো উন্নয়নসহ অনেক সমস্যা আছে। মন্ত্রী হলে জেলার উন্নয়ন ত্বরান্বিত হতে পারত।’