কুয়ালালামপুর : বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার দীর্ঘদিনের কৌশলগত ও শ্রমনির্ভর কূটনৈতিক সম্পর্কে দেখা দিয়েছে নজিরবিহীন স্থবিরতা। দায়িত্ব গ্রহণের তিন মাস পার হলেও মালয়েশিয়ার রাজার কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয়পত্র (Credentials) পেশ করতে ব্যর্থ হয়েছেন বাংলাদেশের হাইকমিশনার মনজুরুল করিম খান চৌধুরী। কূটনৈতিক মহলে এই বিলম্বকে অস্বাভাবিক ও উদ্বেগজনক বলে মনে করা হচ্ছে।
এই কূটনৈতিক স্থবিরতার মধ্যেই কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ হাইকমিশনের অভ্যন্তরে দুর্নীতি আড়াল, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ এবং প্রবাসীদের কণ্ঠরোধের অভিযোগ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রবাসীদের হয়রানি বন্ধ নয়, বরং তা আড়াল করতেই নেওয়া হচ্ছে একের পর এক গোপন সিদ্ধান্ত।
দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমের ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে কুয়ালালামপুর হাইকমিশনের একাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর দুর্নীতি, বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সন্দেহজনক যোগাযোগ এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অভিযোগ উঠে এসেছে।
বিশ্বস্ত সূত্রগুলোর দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগকে আন্তর্জাতিকভাবে তুলে ধরতে হাইকমিশনের সামনে পরিকল্পিতভাবে মানববন্ধন করানো হয়, যেখানে মালয়েশীয় নাগরিকদের ব্যবহার করা হয়। একই সময়ে নিরীহ বাংলাদেশি শ্রমিকদের বিরুদ্ধে “জঙ্গি সংশ্লিষ্টতা”র অভিযোগ তুলে আটক করানোর চেষ্টার ঘটনাও আলোচনায় আসে। যা কূটনৈতিক শিষ্টাচার ও মানবাধিকারের পরিপন্থী বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এইসব অভিযোগ ও গণমাধ্যমের চাপের মুখে সাবেক হাইকমিশনার শামীম আহসান, ডেপুটি হাইকমিশনার খুরশিদ আলম খাস্তগীর, প্রেস সেক্রেটারি সুফী মারুফ এবং ভিসা কাউন্সিলরকে কুয়ালালামপুর থেকে প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, এটি ছিল হাইকমিশনের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রথম বড় প্রশাসনিক পদক্ষেপ।
বিশ্বস্ত সূত্রের দাবি, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা, জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগে মানববন্ধনের নেপথ্য পরিকল্পনা এবং দূতাবাসের স্থান পরিবর্তন কালীন আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে দূতালয় প্রধান প্রণব কুমারকে প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু হলে হাইকমিশনার মনজুরুল করিম খান চৌধুরীর মধ্যে চরম অস্বস্তি ও আতঙ্ক দেখা দেয়।
সূত্রগুলো বলছে, তদন্তের পরিধি আরও বিস্তৃত হলে হাইকমিশনের শীর্ষ পর্যায়ও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
দুর্নীতির বিষয়গুলো যাতে জনসম্মুখে আর না আসে, সে লক্ষ্যে হাইকমিশনের অভ্যন্তরে সাংবাদিকদের যাতায়াত সীমিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
একটি জরুরি বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যেখানে উপস্থিত ছিলেন হাইকমিশনার মনজুরুল করিম খান, দূতালয় প্রধান প্রণব কুমার, কাউন্সিলর মুর্শেদ আলম এবং শ্রমবিভাগের কর্মকর্তারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সিনিয়র কর্মকর্তা জানান,
“হাইকমিশনার স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন, কোনো কর্মকর্তা যেন সাংবাদিকদের কোনো তথ্য না দেন। নির্দেশ অমান্য করলে কঠোর শাস্তির হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।”
হাইকমিশনার মনজুরুল করিম খানের কূটনৈতিক দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিদেশে কর্মরত একাধিক কর্মকর্তা। জানা গেছে, তার প্রায় সব পদোন্নতিই এসেছে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। ব্রুনাই ও ইরানে দায়িত্ব পালনের পর তিনি মালয়েশিয়ায় নিয়োগ পান।
পরিচয় গোপন রাখার শর্তে ইরানে কর্মরত এক সাবেক কূটনীতিক বলেন,
“তার সময়ে ইরান-বাংলাদেশ সম্পর্কের কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। কূটনীতিক হিসেবে তিনি কার্যকর ছিলেন না।”
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা মন্তব্য করেন,
“মালয়েশিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ ও শ্রমনির্ভর দেশে এমন একজন অদক্ষ কর্মকর্তাকে পাঠানো হয়েছে। এটি রাষ্ট্রীয় স্বার্থের জন্য উদ্বেগজনক।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, কূটনৈতিক অচলাবস্থা ও হাইকমিশনের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা মালয়েশিয়ায় বসবাসরত লাখো বাংলাদেশি শ্রমিকের সংকটকে আরও তীব্র করছে। স্থানীয় মালয়েশিয়ান গণমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই বাংলাদেশিদের আটক ও গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশিত হচ্ছে।
তাদের মতে, দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরার পর কুয়ালালামপুর হাইকমিশনে দক্ষ, স্বচ্ছ ও অভিজ্ঞ কূটনীতিক নিয়োগ দেওয়া এখন সরকারের নৈতিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। অন্যথায়, বাংলাদেশ–মালয়েশিয়া সম্পর্কের পাশাপাশি প্রবাসীদের ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।