শিরোনাম :
হরমুজ প্রণালীতে নতুন ‘নিয়ম’ ঘোষণা ইরানের, সব জাহাজে কঠোর নিয়ন্ত্রণ মিয়ানমার আউং সান সু চির সাজা কমাল, হাজারো বন্দিকে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা কুয়ালালামপুরে সশস্ত্র ডাকাতি মামলায় ডিএসপি সহ ৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন ১৩টি ‘হটস্পট’ পেট্রোল স্টেশনে কড়া নজরদারি, জ্বালানি পাচার রোধে পুলিশের অভিযান জোরদার ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা ‘শেষের পথে’, বিশ্বকে ‘দুই অসাধারণ দিনের’ প্রস্তুতির আহ্বান ট্রাম্পের ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি বাড়াতে সক্রিয় তুরস্ক, আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান এরদোয়ানের পেনাংয়ে মাদকবিরোধী অভিযানে আটক ২, জব্দ ৩ লাখ রিঙ্গিতের বেশি মূল্যের মাদক ও সম্পদ কুয়ালালামপুরে আটক মানবপাচার চক্রের ‘মাস্টারমাইন্ড’১১১টি পাসপোর্ট, ১০টি ল্যাপটপ, ছয়টি মোবাইল ফোন উদ্ধার “মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে হুন্ডি চক্র ফের সক্রিয়, বৈধ রেমিট্যান্স প্রবাহে প্রভাবের শঙ্কা” মালয়েশিয়ায় উন্মুক্ত শ্রমবাজার,হাইকমিশনে বহাল তবিয়তে দুর্নীতির বরপুত্র তিন খলিফা

জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেই নিত্যপণ্যের বাজারে আগুন কেন?

পিবিএন টিভি ২৪ রিপোর্ট:
  • সর্বশেষ আপডেট: রবিবার, ১৫ জুন, ২০২৫

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার খবর এলেই বাজার যেন হঠাৎ কাঁপতে শুরু করে। ট্রাকভর্তি চাল আসুক বা ভ্যানভর্তি শাকসবজি, সব কিছুর দামই যেন আচমকা বেড়ে যায়। প্রশ্ন জাগে, তেলের সঙ্গে পেঁয়াজের আবার কী সম্পর্ক? কিন্তু অর্থনীতির বাস্তবতা বলছে, তেলের দাম একা বাড়ে না তার সঙ্গে টেনে তোলে পুরো বাজার ব্যবস্থাকেই।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি খাত হলো অর্থনীতির হৃদস্পন্দন। এর সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে কৃষি, শিল্প, পরিবহন, উৎপাদন, বাজারজাতকরণ এমনকি সরকারের নীতিনির্ধারণ। তাই এক লিটার ডিজেল বা অকটেনের দাম ৫ টাকা বাড়লে তার প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় খুদের প্যাকেট থেকে শুরু করে পাকা চাল পর্যন্ত সব কিছুর দামে।

অর্থনীতি বিশ্লেষকরা বলেন, এর পেছনে রয়েছে বিশ্ববাজারের অস্থিরতা, বৈশ্বিক ভূরাজনীতি, ডলার সংকট, আমদানি নির্ভরতা এবং দেশীয় বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। ফলে তেলের মূল্যবৃদ্ধি মানেই বাজারের সর্বত্র একপ্রকার আগুন।

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল-ইরান টানাপোড়েনর কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম এক লাফে ১৩ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৭৫ ডলার ছাড়িয়েছে, যা গত পাঁচ মাসে সর্বোচ্চ। একই সঙ্গে স্বর্ণের দামও রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। শুক্রবার লন্ডন স্পট মার্কেটে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম উঠেছে ৩ হাজার ৪৩৫ ডলারে। থাইল্যান্ডে স্বর্ণের দাম ভরি প্রতি ৫৩ হাজার ৩৫০ থাই বাথে পৌঁছেছে। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এই দাম ৪ হাজার ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিশ্ববাজারের দাম ওঠানামা

বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম যখন বাড়ে, তখন বাংলাদেশের মতো আমদানি নির্ভর দেশগুলো সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা, বা ওপেক সদস্য দেশগুলোর উৎপাদন সীমিত করার সিদ্ধান্ত, এসবই তেলের আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়িয়ে তোলে।

২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের পর একসময় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৩০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। তার সরাসরি প্রভাব পড়ে বাংলাদেশে, যেখানে সরকারকে ডিজেল, পেট্রল, অকটেনের দাম বাড়াতে হয় কয়েক দফায়।

ডলার সংকট ও আমদানি খরচ বেড়ে যাওয়া

বাংলাদেশে জ্বালানি তেল কিনতে ডলারে দাম পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু ডলার সংকটে ভুগছে দেশের অর্থনীতি। ২০২৩ সাল থেকে টাকার মান কমে যাওয়ায় আমদানির খরচও অনেক বেড়ে গেছে।

যেখানে আগে প্রতি ব্যারেল তেল আমদানিতে ৯০ ডলার খরচ হতো, এখন একই তেল কিনতে খরচ হচ্ছে ১১০ থেকে ১২০ ডলার। সেই বাড়তি খরচ পুষিয়ে নিতে সরকারকে পেট্রোল পাম্পে দাম বাড়াতে হয়। এতে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয় পরিবহন খাত ও ভোক্তারা।

চীনের উৎপাদন ব্যাঘাত, শিপিং সংকটের প্রভাব

বিশ্বের বৃহত্তম পণ্য উৎপাদনকারী দেশ চীনে কোভিড পরবর্তী সময়েও উৎপাদন স্বাভাবিক হয়নি। চীনের যেকোনো জ্বালানিখাতে চাপ পড়লে বিশ্ববাজারে দাম বাড়ে। এ ছাড়া লোহা, তেল, সার, খাদ্যপণ্য ইত্যাদি বহনকারী আন্তর্জাতিক শিপিং খরচ ২০২৩ ও ২০২৪ সালে দফায় দফায় বেড়েছে। এই খরচও দেশের আমদানির ওপর প্রভাব ফেলে, ফলে এক পর্যায়ে ভোক্তাপর্যায়ে মূল্যবৃদ্ধি হয়ে ওঠে অনিবার্য।

উন্নত দেশগুলোর মুদ্রানীতি ও সুদের হার

যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ উন্নত দেশগুলো মূল্যস্ফীতি ঠেকাতে সুদের হার বাড়িয়েছে। এতে করে বিশ্বজুড়ে ডলার সঙ্কুচিত হচ্ছে, যা আমদানি নির্ভর দেশগুলোর জন্য চাপ তৈরি করছে।

বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতি আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে যদি জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার স্থিতিশীল না হয়।

পরিবহন খরচ বাড়ে, দাম বাড়ে বাজারে

জ্বালানি তেল দেশের পণ্য পরিবহনের মূল চালিকা শক্তি। রাজধানীর বাজারে যেসব চাল, ডাল, আলু, পেঁয়াজ, মাছ কিংবা তেল আসে তার অধিকাংশই ট্রাক, পিকআপ কিংবা নৌবাহী যান দিয়ে আসে দূর-দূরান্ত থেকে। এইসব যানবাহন চলে মূলত ডিজেলে।

যখন ডিজেলের দাম বাড়ে, পরিবহন খরচ বেড়ে যায় প্রায় সমানুপাতিকভাবে। যেমন, এক হাজার টাকার ভাড়ায় যে ট্রাক মাল আনার চুক্তি হয়, তেলের দাম বাড়লে সেই খরচ হয়ে যায় ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত। এই বাড়তি টাকা ব্যবসায়ীরা পণ্যের দামে যোগ করে নেন। অর্থাৎ, মূল্যবৃদ্ধির প্রথম ধাক্কা আসে পরিবহনের খরচ থেকে।

উৎপাদন খরচও বেড়ে যায় চুপিসারে

দেশের বহু পণ্য উৎপাদন হয় ছোট-বড় কারখানায়, মিল-ফ্যাক্টরিতে। এসব স্থানে বিদ্যুৎ ছাড়াও জ্বালানি তেল, ফার্নেস অয়েল বা জেনারেটর ব্যবহার করা হয়। তেলের দাম বাড়লে শুধু কাঁচামাল নয়, শ্রমিক পরিবহন, যন্ত্রচালনা, বয়লার অপারেশনসহ সব কিছুর খরচ বাড়ে। ফলে এক কেজি প্যাকেট দুধ, এক বোতল তেল, এমনকি এক কৌটা বিস্কুট তৈরির খরচ বাড়ে। শেষপর্যন্ত খরচের এই বাড়তি চাপ পড়েই যায় ভোক্তার পকেটে।

কৃষি উৎপাদনেও প্রভাব পড়ে

বাংলাদেশের কৃষকরা সেচের জন্য বড় একটি অংশে ডিজেলচালিত পাম্প ব্যবহার করেন। এক বিঘা জমি চাষে যেমন ট্রাক্টর লাগে, তেমনি লাগবে সেচ যার অধিকাংশই ডিজেলনির্ভর। তেলের দাম বাড়লে কৃষকের খরচ বেড়ে যায় সরাসরি। একই জমিতে আগের চেয়ে বেশি খরচ করে উৎপাদন করলে তিনি বিক্রি করার সময় সেই খরচও অন্তর্ভুক্ত করেন। ফলে চাল, আলু, সবজির দামও বাড়ে অনিবার্যভাবে।

বাজারে কৃত্রিম সংকট ও দুর্বল নজরদারি

বাংলাদেশের বাজার ব্যবস্থায় ব্যবসায়ীরা প্রায়ই ‘আগাম মুনাফা’ আদায়ের চেষ্টা করেন। অনেক সময় দেখা যায়, তেলের দাম বাড়ার ঘোষণা এলেই বাজারে কোনো কারণ ছাড়াই অনেক পণ্যের দাম বেড়ে যায়। এটা ঘটে মূলত বাজারের ‘মানসিক প্রতিক্রিয়া’ বা সাইকোলজিক্যাল ইফেক্টের কারণে। ব্যবসায়ীরা ভাবেন সামনে আরও দাম বাড়বে, তাই আগে থেকেই মজুদ করেন, দাম বাড়ান। ফলে এক ধরনের কৃত্রিম সংকটও তৈরি হয়।

মূল্যস্ফীতি চক্রে পড়েন সাধারণ মানুষ

এক কেজি চালের দাম ৫ টাকা বাড়লে তার সঙ্গে বাড়ে লবণ, ডাল, ভোজ্যতেল, এমনকি পানির দামও। আর এই একত্রিত প্রভাব তৈরি করে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। কারণ তাদের আয় বাড়ে না, অথচ ব্যয় বেড়ে যায় প্রতিনিয়ত।

আরো পড়ুন

© All rights reserved © pbntv24
Developer Vom Tech
Translate »