রামাত গান, ইসরায়েল | ২১ জুন
ইরান থেকে আসা লাগাতার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ভয়ে ইসরায়েলের শত শত বেসামরিক নাগরিক এখন রাত কাটাচ্ছেন পাতাল রেলস্টেশনগুলিতে। এসব স্টেশন অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
৩৪ বছর বয়সী ইভেন্ট প্ল্যানার আজিজা মেলেখ বলেন, “শেষ কয়েকদিনে প্রথমবারের মতো একটু স্বস্তি পেলাম,”—তিনি টেল আভিভ ও রামাত গান সীমান্তে অবস্থিত একটি পাতাল রেলস্টেশনে তার ইনফ্ল্যাটেবল ম্যাট্রেসে শুয়ে পড়ার পর বলছিলেন।
যুদ্ধকালীন পাতাল জীবন
১৩ জুন ইসরায়েল ইরানের সামরিক ও পরমাণু স্থাপনায় বিমান হামলা চালানোর পর যুদ্ধ শুরু হয়। পাল্টা জবাবে ইরান ৪৫০টিরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১,০০০-র বেশি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। এতে ইসরায়েলে অন্তত ২৪ জন নিহত ও শতাধিক আহত হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছে ৪০টিরও বেশি স্থাপনা, যার মধ্যে রয়েছে অ্যাপার্টমেন্ট ভবন ও হাসপাতাল।
আজিজা ও তার মতো অনেকেই রাতে হঠাৎ সাইরেন বাজলে আতঙ্কে দৌড়ানোর পরিবর্তে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে পাতাল রেলস্টেশনকেই বেছে নিচ্ছেন। অনেকে বালিশ, কম্বল, পোষা প্রাণী, খাবারসহ এখানে আসছেন। শিশুরা তাদের খেলনা নিয়ে এসেছে, তরুণেরা ট্যাবলেটে সিনেমা দেখছে, কেউ কেউ আবার পিৎজা খাচ্ছেন।
আজিজার বান্ধবী সোনিয়া শ্রাইবমেন বলেন, “প্রতিবার সাইরেন বাজলে দৌড়ানো খুব ভয়ের। একবার রাস্তায় পড়ে গিয়েছিলাম, তাই আজ এখানেই রাতে থাকছি।”
অতীতের ছায়া
আজিজা বলেন, “এই দৃশ্যটা আমার দাদার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গল্পগুলো মনে করিয়ে দেয়। এখন আমরাও নাতি-নাতনিদের এমন গল্প বলব—রাতে রেলস্টেশনে ঘুম, ওপর থেকে সাইরেন।”
যুদ্ধের কারণে টেল আভিভের পাতাল লাইট রেল বন্ধ রয়েছে। এর কয়েকটি স্টেশন এখন প্রতিরাতের আশ্রয়স্থল। স্বেচ্ছাসেবীরা কফি, স্ন্যাকস, এমনকি শিশুদের জন্য ছোট্ট অনুষ্ঠানও আয়োজন করছেন।
সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ প্রবাসীরা
প্রায় অর্ধেক আশ্রয়প্রার্থীই প্রবাসী শ্রমিক, যাদের অনেকেই পুরনো ভবনে থাকেন যেখানে নিরাপদ রুম নেই। নতুন ভবনগুলোতে আইন অনুযায়ী সেফ রুম থাকলেও গরিব ও আরব এলাকায় নিরাপত্তার ব্যবস্থা দুর্বল।
১০ বছর ধরে ইসরায়েলে থাকা ভারতীয় গৃহ পরিচারক বাবু চিন্নাবেরি বলেন, “এই সপ্তাহটা আগে কখনো অনুভব করিনি। ক্ষেপণাস্ত্র এত শক্তিশালী যে খুব ভয় পাচ্ছি।”
স্টেশনের বাইরেও আশ্রয়
শুধু রেলস্টেশন নয়, শহরের একটি বড় শপিং মলের পার্কিং গ্যারেজেও ৪০০ জনের বেশি মানুষ রাতে ঘুমাচ্ছেন। প্রতিটি পার্কিং স্পটে একটি করে তাঁবু বানানো হয়েছে। এছাড়া বহুদিন পর খুলে দেওয়া হয়েছে টেল আভিভের সেন্ট্রাল বাস স্টেশনের পরমাণু বাংকার, তবে নোংরা ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশের কারণে খুব কম মানুষই সেখানে যাচ্ছেন।
পরিবার নিয়ে নিরাপদে
৪৫ বছর বয়সী রোই আসরাফ তার স্ত্রী ও তিন বছর বয়সী মেয়েকে নিয়ে রামাত গানের পাতাল স্টেশনে থাকছেন, যদিও তাদের বাড়িতেও নিরাপদ রুম আছে। “আমি ঝুঁকি নিতে চাই না,” তিনি বলেন।
তাদের প্রতিরাতের রুটিন হলো—ঘরে গোসল, পাজামা পরা, তারপর সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে স্টেশনে যাত্রা। সেখানেই স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীরা শিশুদের জন্য অনুষ্ঠান করেন।
“যদি এক সপ্তাহ স্টেশনে থাকতে হয়, তাও আমি রাজি—যদি এতে সব কিছু নিরাপদ হয়,” আসরাফ বলেন।
আতঙ্কে একটি জাতি
যুদ্ধের ফলে ইরান ও ইসরায়েল—উভয় দেশেই হাজার হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। একটি মার্কিনভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা জানিয়েছে, ইরানে ইতোমধ্যে ৬০০ জনেরও বেশি নিহত হয়েছে, যার মধ্যে ২০০ জনেরও বেশি বেসামরিক নাগরিক।
রোজ রাতে সাইরেন বাজা, ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত—এই বাস্তবতায় এখন অনেক ইসরায়েলি নাগরিকের নিরাপদ আশ্রয় হচ্ছে আর কংক্রিটের পাতালে, নিজেদেরই শহরের নিচে।