সিঙ্গাপুর, ৯ অক্টোবর : আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ক উত্তাল ও অনিশ্চিত থাকলেও বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি ও খোলামেলা যোগাযোগ বজায় রাখলে উত্তেজনা প্রশমিত হতে পারে বলে মত দিয়েছেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা।
বৃহস্পতিবার সিঙ্গাপুরের রিটজ-কার্লটন, মিলেনিয়া হোটেলে অনুষ্ঠিত এশিয়া ফিউচার সামিট ২০২৫ এর এক প্যানেল আলোচনায় বক্তারা বলেন, দুই পরাশক্তির মধ্যে প্রতিযোগিতা ও সংঘাত অব্যাহত থাকবে, তবে প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও কূটনৈতিক যোগাযোগে সহযোগিতা বাড়লে স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে।
সিঙ্গাপুরের বিনিয়োগ সংস্থা তেমাসেকের আন্তর্জাতিক নীতি ও প্রশাসন বিভাগের প্রধান আশোক মিরপুরি, যিনি ২০১২ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে সিঙ্গাপুরের রাষ্ট্রদূত ছিলেন, বলেন
“দুই পক্ষই এখন বুঝতে পারছে, তাদের মধ্যে বড় ধরনের সংঘাত হলে তা সবার জন্যই ভয়াবহ হবে। তাই যোগাযোগের পথ খোলা রাখা অত্যন্ত জরুরি।”
তিনি সতর্ক করেন, তাইওয়ান ইস্যু এখনও সবচেয়ে বড় অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি তৈরি করছে।
চীনের ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক অধ্যয়ন ইনস্টিটিউটের ডিন ড. উ শিনবো বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এখনো চীনকে নিয়ন্ত্রণ ও দমন করার নীতি অনুসরণ করছে। তবে চীনের প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি অব্যাহত থাকলে যুক্তরাষ্ট্র বুঝতে পারবে তার সীমাবদ্ধতা কোথায়।
“বাস্তববাদী ও বাস্তবমুখী দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করলে যুক্তরাষ্ট্র চীন সম্পর্ক স্থিতিশীলতার পথে এগোতে পারে,” মন্তব্য করেন ড. উ।
তিনি আরও বলেন, দুই দেশকে এখনই সংকট ব্যবস্থাপনা ও আস্থা পুনর্গঠনের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে ভুল বোঝাবুঝি ও সংঘাত এড়ানো যায়।
এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও সাবেক মার্কিন উপ-বাণিজ্য প্রতিনিধি ওয়েন্ডি কাটলার বলেন
“যখন দুই দেশের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়, তখনই বিশ্বের উদ্বেগ বাড়ে।”
প্যানেল আলোচনায় বক্তারা দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য এপেক সম্মেলনে আসন্ন ডোনাল্ড ট্রাম্প–শি জিনপিং বৈঠক নিয়ে আশাবাদ ও সংশয় দুই ধরনের মত প্রকাশ করেন।
কাটলার বলেন, তিনি ‘বাস্তবসম্মত ফলাফল’ আশা করছেন, যেমন টিকটকের মার্কিন ব্যবসা বিক্রির ঘোষণা বা শুল্কবিরতির সাময়িক সমঝোতা। তবে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্য চুক্তি এখনই সম্ভব নয়।
অন্যদিকে ড. উ তুলনামূলকভাবে আশাবাদী, তিনি বলেন, বৈঠকটি থেকে ২০ শতাংশ মার্কিন শুল্ক প্রত্যাহারের মতো ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
“যদি দুই বৃহত্তম অর্থনীতি সংঘাত কমিয়ে সহযোগিতার পথে আসে, তা বিশ্ববাজারে স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত দেবে,” — তিনি যোগ করেন।
মিরপুরি বলেন, অর্থনৈতিক আলোচনা যতই অগ্রসর হোক না কেন, তাইওয়ান ইস্যু এখনো “বড় ধরনের ভুল হিসাবের ঝুঁকি” বহন করছে।
আলোচনায় বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তন নিয়েও মত দেন বক্তারা। কাটলার বলেন, চীনের নতুন গ্লোবাল গভর্ন্যান্স ইনিশিয়েটিভ “বেশি কথার, কম কাজের” একটি প্রচেষ্টা। অন্যদিকে ড. উ জানান, যুক্তরাষ্ট্রের পিছিয়ে পড়ায় চীন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সক্রিয় ভূমিকা নিচ্ছে—বিশেষ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় (WHO) অর্থায়ন বাড়িয়ে।
শেষে মিরপুরি বলেন, ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক, ব্রাজিলের মতো মধ্যম শক্তিগুলো এখন নতুন বৈশ্বিক ভারসাম্য রচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে শুরু করেছে।
“বিশ্বায়নের একটি নতুন মানচিত্র গঠিত হচ্ছে,” তিনি বলেন। “বড় শক্তির প্রতিযোগিতার মাঝেও অন্য দেশগুলো নিজেদের স্থিতিশীলতা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে সংগঠিত করছে।”