সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে সময়ে সময়ে মতপার্থক্য দেখা দিতে পারে। তবে এসব মতভেদ যেন দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্ককে বাধাগ্রস্ত না করে, এমন মন্তব্য করেছেন সিঙ্গাপুরের প্রেসিডেন্ট থারমান শানমুগারত্নম।
মালয়েশিয়ায় চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরের আগে দেশটির জাতীয় বার্তা সংস্থা বার্নামাকে দেওয়া এক লিখিত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, দুই দেশ বরাবরই মতপার্থক্য এড়িয়ে যাওয়ার পরিবর্তে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা করেছে। একই সঙ্গে পারস্পরিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে। এভাবেই সময়ের সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে আস্থা ও সদিচ্ছার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।
মালয়েশিয়ার রাজা সুলতান ইব্রাহিম সুলতান ইস্কান্দারের আমন্ত্রণে এই সফরে যাচ্ছেন থারমান শানমুগারত্নম। তিনি বলেন, এই সফর দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পাশাপাশি সব পর্যায়ে পারস্পরিক বোঝাপড়া আরও গভীর করার প্রতীক।
থারমান বলেন, ‘আমাদের অংশীদারত্ব শুধু অভিন্ন ইতিহাসের ওপর নয়, বরং একে অপরের স্বার্থের প্রতি পারস্পরিক সম্মান ও বোঝাপড়ার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। এটি কখনোই শুধু লেনদেনভিত্তিক সম্পর্ক ছিল না, ভবিষ্যতেও হওয়া উচিত নয়।’
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ২০২৪ সালের মে মাসে সুলতান ইব্রাহিম সুলতান ইস্কান্দার সিঙ্গাপুরে রাষ্ট্রীয় সফর করেছিলেন। ওই বছরের জানুয়ারিতে মালয়েশিয়ার রাজা হিসেবে সিংহাসনে আরোহণের পর সেটিই ছিল তাঁর প্রথম বিদেশ সফর।
সিঙ্গাপুরের প্রেসিডেন্ট বলেন, দুই প্রতিবেশী দেশকে অতীতে বেশ কয়েকটি সংবেদনশীল ও জটিল দ্বিপক্ষীয় বিষয় মোকাবিলা করতে হয়েছে। ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী এবং অভিন্ন ইতিহাস থাকা দেশগুলোর ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতি অস্বাভাবিক নয়।
তবে তিনি বলেন, উভয় দেশের ধারাবাহিক সরকার কখনোই এসব ইস্যুকে সামগ্রিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে দেয়নি। বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে শান্তিপূর্ণভাবে সমস্যার সমাধানে গুরুত্ব দিয়েছে।
থারমানের ভাষায়, দুই দেশের নেতা, সরকারি কর্মকর্তা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে গড়ে ওঠা উচ্চমাত্রার পারস্পরিক আস্থা ও পরিচিতি মতবিরোধ সংলাপ ও বোঝাপড়ার মাধ্যমে সমাধান করার সুযোগ তৈরি করেছে।
তিনি বলেন, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বিরোধ না থাকার ওপর নির্ভর করে না; বরং বিরোধকে দায়িত্বশীলভাবে পরিচালনা করার সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ান এবং বৃহত্তর অঞ্চলের জন্যও সংলাপ, সংযম, সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা এবং নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার গুরুত্ব তুলে ধরে।
তিনি আরও বলেন, দুই দেশের রাজনৈতিক নেতা, সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগের প্রজন্মের মধ্যে এটি স্বাভাবিক ছিল। এখন দ্বিপক্ষীয় বিনিময় কর্মসূচি, যুব নেতৃত্ব ফোরাম ও কমিউনিটিভিত্তিক উদ্যোগের মাধ্যমে এসব যোগাযোগ আরও বাড়াতে হবে।
থারমান বলেন, সীমান্তের দুই পাশে মানুষের মধ্যে বন্ধুত্ব যত গভীর হবে, দীর্ঘমেয়াদে দুই দেশের সম্পর্কও তত বেশি শক্তিশালী ও স্থিতিশীল হবে।
বিশ্বের বর্তমান অস্থির পরিস্থিতিতে গত ৬০ বছরে গড়ে ওঠা পারস্পরিক আস্থা সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়াকে অর্থনৈতিক সংযোগ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, মানবসম্পদ উন্নয়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও বাড়ানোর ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থার বিভাজন এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা বাড়ার প্রেক্ষাপটে দুই দেশের উচিত আঞ্চলিক সংহতি আরও জোরদার করা। বাজারের সংযোগ বাড়ানো, জ্বালানি ও সরবরাহব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও কার্বন ক্রেডিটের মতো খাতে যৌথভাবে কাজ করার সুযোগ রয়েছে।
থারমান বলেন, জোহর-সিঙ্গাপুর বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং র্যাপিড ট্রানজিট সিস্টেম (আরটিএস) রেলসংযোগ প্রকল্প দুই দেশের জনগণের ভবিষ্যতের জন্য যৌথ বিনিয়োগের উজ্জ্বল উদাহরণ। নিজ নিজ শক্তিকে কাজে লাগিয়ে কীভাবে উভয় পক্ষ লাভবান হতে পারে, এসব প্রকল্প তারই প্রমাণ।
তিনি আরও বলেন, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া একসঙ্গে কাজ করে উন্মুক্ত ও নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা রক্ষা, আসিয়ানের সংহতি জোরদার এবং জোটটির বৈশ্বিক অংশীদারত্ব সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মালয়েশিয়ার ২০২৫ সালের সফল আসিয়ান সভাপতিত্বের কথাও উল্লেখ করেন থারমান। তিনি বলেন, ওই সময় পূর্ব তিমুরকে আসিয়ানের ১১তম সদস্য হিসেবে স্বাগত জানানোসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। ২০২৭ সালে সিঙ্গাপুর আসিয়ানের সভাপতিত্ব গ্রহণের আগে এই অগ্রযাত্রা আরও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।