পালিয়ে যাওয়া স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার শাসনামলে গুম ও খুনে যারা জড়িত ছিলেন, তাদের যেন বিচার এড়িয়ে দেশ ছাড়ার সুযোগ না দেওয়া হয়—এমন আহ্বান জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)।
শনিবার (১১ অক্টোবর) এক বিবৃতিতে ডাকসু নেতারা বলেন, গুমের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের দেশত্যাগের গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে তারা সরকার ও আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর প্রতি আহ্বান জানান, যাতে কেউ দায়মুক্তি বা ‘সেফ এক্সিট’ না পায়।
ডাকসুর বিবৃতিতে বলা হয়, “গুম–খুন, নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের নির্দেশদাতা হিসেবে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার প্রশাসনের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে।”
আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সরকারের আমলে সংঘটিত গুমের অভিযোগ তদন্ত করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গত মঙ্গলবার শেখ হাসিনাসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। অভিযুক্তদের মধ্যে সাবেক ও বর্তমান সেনা কর্মকর্তাও রয়েছেন।
বিবৃতিতে ডাকসু নেতারা আরও বলেন, এই পদক্ষেপে গুম ও রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের শিকার পরিবারগুলোর দীর্ঘ দিনের ক্ষোভ ও বেদনায় কিছুটা আশার আলো দেখা দিয়েছে। তবে, এটি যথেষ্ট নয়—সব অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
তারা বলেন, “চিহ্নিত অপরাধীদের দায়মুক্তি দেওয়ার যেকোনো ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজ সোচ্চার থাকবে।”
গুম কমিশনের তদন্ত স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পরিচালনার আহ্বান জানিয়ে ডাকসু নেতারা বলেন, ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, “বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার সময় ছিল বিগত আওয়ামী ফ্যাসিবাদী শাসনামল। সেই সময়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সংঘটিত গুম, খুন, নির্যাতন, মিথ্যা মামলা ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করেছিল।”
গুম কমিশনের প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে তারা জানান, ইতিমধ্যে ১৮০০-এর বেশি গুমের অভিযোগ জমা পড়েছে। গুমের শিকারদের মধ্যে সাধারণ নাগরিক, শিক্ষার্থী, নারী, শ্রমজীবী মানুষ এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা–কর্মীরা রয়েছেন। এমনকি শিশুরাও এ নৃশংসতা থেকে রেহাই পায়নি।
বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বহু শিক্ষার্থী ও ছাত্রনেতা গুম–খুনের শিকার হয়েছেন বলেও উল্লেখ করা হয় বিবৃতিতে।
ডাকসুর ভাষ্য অনুযায়ী, গুম-খুন ও মানবতাবিরোধী অপরাধে শুধু শেখ হাসিনা ও তার রাজনৈতিক মহল নয়, বরং ডিজিএফআই, র্যাবসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সংস্থা ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন।
তারা বলেন, “দেশে সত্যিকারের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা না হলে সেনাবাহিনী, র্যাব, পুলিশসহ রাষ্ট্রের কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জনগণের আস্থা ফিরে পাবে না। অপরাধীদের বিচার এসব বাহিনীর মর্যাদা ক্ষুণ্ন করবে না; বরং তাদেরকে আরও গণমুখী ও বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠানে পরিণত করবে।”
গুম কমিশনের প্রতিবেদনে একটি পার্শ্ববর্তী দেশের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পৃক্ততার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে বলে জানায় ডাকসু। বিবৃতিতে বলা হয়, “এই সম্পৃক্ততা বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি গভীর হুমকি।”